দ্বীপ জেলা ভোলার মধ্যে যেন আরেক খন্ড দ্বীপ চর নেয়ামতপুর । চারদিকে জলরাশি মাঝে এক খন্ড সবুজ ।

কৃষক ও জেলেদের বাস সেখানে। খাল-বিল সাঁকো আর ধান ক্ষেতের মাঝে সরু আইল দিয়ে চলাচল করতে হয় । নেই কোন রাস্তা-ঘাট। কখনও কখনও কাঁচা মেঠো পথ দেখা গেলেও বর্ষায় সেখানে হাটু পরিমান পানি ।

জমিতে অন্য ফসলের চাষাবাদ না হলেও আমন ধান চাষ হয় প্রতিবছর । চরের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক । আর দশটা চরের চেয়ে ভিন্ন এ চরের চিত্র । কোন স্কুল না থাকায় তিন শতাধিক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে বেড়ে উঠছে ।

স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শুরু করে নেই কোন আশ্রয় কেন্দ্রও । চরবাসীর মাঝে কেবল হাহাকার । সেই সাথে চর দখল আর লাঠিয়াল বাহিনীর আতংক তাদের পিছু ছাড়ে না । নানা সমস্যায় জর্জরিত এ চরবাসী।

নেয়ামতপুর চর এক সময় দৌলতখান উপজেলার অন্তর্গত ছিল নেয়ামতপুর ইউনিয়ন হিসেবে। কিন্তু ১৯৭১ সনে রাক্ষুসে মেঘনার ভাঙ্গনে নেয়ামতপুর ইউনিয়ন বিলীন হয়ে যায়।

কয়েক হাজার পরিবার ভূমিহীন হয়ে সর্বশান্ত হয়। তার পর নদীর ভাঙ্গা গড়ার খেলায় কয়েক বার এই চরটি জেগে ওঠে। এখন এই চরটি দৌলতখানের মেদুয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত।

সর্বশেষ ১৯৯৭ সনে জেগে ওঠার পর ভূমিহীন পরিবারেরা আবার নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখে। বসতি স্থাপন করে শুরু হয় ওই চরে বেঁচে থাকার লড়াই।

চার দিকে বেড়ি বাঁধ না থাকায় জোয়ার ভাটার উপর নির্ভর করে চলে তাদের জীবন। কারন অতিজোয়ারে যেমন রাস্তা ঘাট ডুবে যায়। তেমনি ভাটায় খালের পানি কমে গেলে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ কয়েক ঘন্টার জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, চরে কোন রাস্তা-ঘাট নেই, কোথাও খাল, কোথাও বিল আবার কোথাও বিস্তৃর্ন ফসলের ক্ষেত। এরমাঝে ছোট ছোট আইল, তা দিয়েই চরাবাসী চলাচলা করেন। মাঝে মধ্যে খালের পানিতে ভিজে পারাপার হতে হয়।

চরের বাসিন্দারা জানালেন, শতাধিক ঘরবাড়ি মিলিয়ে এক থেকে দেড় হাজার মানুষের বাস এ চরে।

কিন্তু বিশাল এ জনগোষ্ঠীর জন্য চরে মাত্র রয়েছে ৩টি টিউবওয়েল । জীবন রক্ষার্থে চরের পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। আধুনিক যুগে বাস করেও তাদের দিন কাটাতে হচ্ছে আদিম যুগের মতই।

নেই নূন্যতম নাগরিক সুবিধা। চরবাসীর অভিযোগ, নানা সংকটে থেকে ২০ বছর ধরে তারা বসবাস করে আসলেও জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারের দপ্তরের কোন কর্মকর্তারা তাদের খোঁজ খবর নেয় না।

চরের বাসিন্দা মোঃ মিরাজের স্ত্রী নুর জাহান বলেন, আমরা সরকারী সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যসব চরের এলাকার মানুষ যে সুযোগ সুবিধা পায়, তার অর্ধেক সুবিধাও আমরা পাচ্ছিনা। এক কলসি পানি আনতে অনেক কষ্ট করতে হয় আমাদের।

অপর দিকে এ চরে বিদ্যালয় স্থাপন না করায় ৩ শতাধিক শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে কোমলমতী এসব শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্য পড়েছে। এরফলে এই চরের সরকারের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

চরের কৃষক নুর নবী ও তছির মাঝি, ইউসুফ জিলাদার বলেন, বিদ্যালয় না থাকায় ৩ মেয়ে ও ২ জেলেকে পড়ালেখা করাতে পারছি না। আমাদের একটি স্কুল খুবই জরুরুী।

নইলে আমাদের সন্তানেরা আমাদের মতই মূর্খ্য থাকবে আর চাষাদবাদ করে বা মাছ ধরে জীবন কাটাবে। কৃষকবধূ রহিমা বেগম ও রাবেয়া বেগম বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা করাতে পারছি না।

ছেলেরা গরু-মহিষ চড়ায়। তারা পড়ালেখা করার ইচ্ছা করলেও বিদ্যালয়ের অভাবে পড়ালেখার সুযোগ পাচ্ছে না। শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নয়। নেই কোন স্থাস্থ্য ও আশ্রয় কেন্দ্র। অসুখ হলে বিনা চিকিৎসায় ভূগতে হয় আর বন্যা জলোচ্ছাস হলে আল্লাহর উপর ভরসা করে ঘরের মাচার উপর বসবাস করতে হয় নেয়ামতপুর বাসিন্দাদের।

এ ছাড়া এই চর বাসীর অন্যতম এক সমস্যা উচ্ছেদ আতংক। চরের পুরোনো ভূমি মালিক ও নতুন বন্দবস্ত পাওয়াদের নিয়েও চলছে বিরোধ মামলা।

ওই চরের ভূমি মালিক ফেরদৌস আহমেদ বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও প্রভাবশালী ভূমি দস্যুরা বন্দোবস্তের নামে চর দখলের পায়তারা করায় তারা আতংকিত।

এ ব্যাপারে দৌলতখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এতো দিন ওই চরে কোন স্বীকৃতি জন পল্লী না থাকায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। তবে এখন শিক্ষা বিভাগের সাথে কথা বলে স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে।

এসএইচ