বিচারব্যবস্থায় ‘দ্বৈত শাসন’-এর কারণ অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে বিচারকদের পদোন্নতির কোনো নীতিমালা গত ৪৫ বছরেও তৈরি হয়নি। পদোন্নতির জন্য কোনো প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা কিংবা সাক্ষাৎকারেরও রেওয়াজ নেই। বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন বা অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্টই (এসিআর) পদোন্নতির ভিত্তি। ফলে বদলির মতো পদোন্নতির ক্ষেত্রেও নানা অনিয়ম ও জটিলতার অভিযোগ ওঠে।
আর এ রকম একটি সুষ্ঠু নীতিমালা ছাড়াই আগামী মাসের মধ্যে একসঙ্গে শতাধিক অতিরিক্ত জেলা জজের জেলা জজ হওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পাঁচ বছর পর এই পদোন্নতি পাওয়া ব্যক্তিরা সচিব স্কেল পাবেন।
পদোন্নতির জন্য গত সেপ্টেম্বরে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ১৪৮ জন অতিরিক্ত জেলা জজের তালিকা পাঠানো হয় সুপ্রিম কোর্টে। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন দুই বছরের কম সময় আগে যুগ্ম জেলা জজ থেকে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। ১৪৮ জনের মধ্যে দুজন দুর্নীতির অভিযোগে অপসারিত। আবার তাঁদের মধ্যে ইতিমধ্যেই দুজনের পদোন্নতি চূড়ান্ত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে।
২০০৭ সালেও পদোন্নতির জন্য অতিরিক্ত জেলা জজ পদে ছয় বছর কাজ করতে হয়েছে। অথচ এখন দুই থেকে তিন বছরের নিচে ৩৪ জন এবং তিন থেকে চার বছর অতিরিক্ত জেলা জজের কাজ করে ৮৯ জন জেলা জজের প্যানেলভুক্ত হয়েছেন। ১০ থেকে ১৪ বছরের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও আছেন, তবে তাঁরা সংখ্যায় মাত্র আটজন।
একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক জেলা জজ নিয়োগের উদ্যোগ ইতিহাসে নজিরবিহীন। বিচার বিভাগ নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এই গণপদোন্নতি বিচার প্রশাসনে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বাহাত্তরের সংবিধানে জেলা পর্যায়ের অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মধ্য থেকেও অতিরিক্ত জেলা জজ নিয়োগের বিধান ছিল। এই বিধানের আওতায় দুজন বিচারক হয়েছিলেন।
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি (২০০১-০২) মাহমুদুল আমীন চৌধুরী। অন্যজন বগুড়ার আইনজীবী মুজিবর রহমান। পরে বিএনপি আমলে তিনি অর্থ প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী মনে করেন, বাহাত্তরের ওই বিধান ফিরিয়ে আনা উচিত। তিনি এর আগে মামলাজট নিরসনে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের পুনর্নিয়োগ করা উচিত বলে মত দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য ১৯৯৩ সালে গঠিত সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
সাবেক আইন ও বিচারমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, শূন্য পদ থাকলেই তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের জেলা জজ করার উদ্যোগ কতটা সমীচীন, তা ভাবনার দাবি রাখে। বাহাত্তরের ওই বিধানটি ফিরিয়ে আনার ধারণাকে জোরালোভাবে সমর্থন করে তিনি বলেন, ওই বিধান থাকলে জেলা পর্যায়ের অনেক দক্ষ আইনজীবী অধস্তন আদালতে আসতে আগ্রহী হবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার যেহেতু বিচারকদের বয়স দুই বছর বাড়াতে রাজি হয়েছিল, তাই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন।
আদালত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন জেলা জজ পদে বড় ধরনের একটা শূন্যতা হবে তা সবারই জানা ছিল। ’৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই অবসরে যান ২০১৪-১৬ সালে। মাসদার হোসেন মামলার নির্দেশনা অনুযায়ী, বিচারকদের অবসরে যাওয়ার বয়স তিন বছরের পরিবর্তে দুই বছর বাড়ানোর প্রস্তাবও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে আটকে যায় দুই বছর আগেই।
একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি গতকাল বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল জেলা জজ নয়, অতিরিক্ত জেলা জজ দিয়ে চালানো উচিত। এদিকে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার নিশ্চিত করেছেন যে, জেলা প্রশাসক নিয়োগে অনধিক ৪০ জনের একটি তালিকা সার্বক্ষণিকভাবে বহাল থাকে। পদ শূন্য হওয়ামাত্রই ওই তালিকা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু জেলা জজদের জন্য এ রকম কোনো তালিকা হয় না।
জেলা জজ হলো বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদ। কিন্তু এই পদে পদোন্নতি পেতে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো সরকারের কোনো কমিটি বা হাইকোর্টের বিচারপতিদের মুখোমুখি হতে হয় না। হাইকোর্টের বিচারক হওয়ার মতোই পুরো প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। অথচ পেশোয়ার ও লাহোর হাইকোর্টের পদোন্নতিবিষয়ক কার্যবিবরণী ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
বর্তমানে জেলা জজের মঞ্জুরীকৃত পদ ২৩০। এর মধ্যে বিচারিক পদ শূন্য ২৮। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১০ জন অবসরে যাবেন। এর বাইরে ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের জন্য আছে। এ ছাড়া দেশে প্রথমবারের মতো আটটি বিভাগীয় শহরে আটটি সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনাল এবং মানব পাচারবিষয়ক দুটি ট্রাইব্যুনাল হচ্ছে। সুতরাং ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রায় ৯০ জনকে জেলা জজ পদে পদোন্নতি দেওয়ার প্রয়োজন হবে।
একটি সূত্রের দাবি, ফুলকোর্টের পদোন্নতিবিষয়ক সিদ্ধান্ত আইন মন্ত্রণালয় মেনে নিতে কখনো গড়িমসি করলেও অগ্রাহ্য করার নজির নেই। জিএ কমিটির সদস্যরাই বাছাই কমিটি হিসেবে কাজ করেন। বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনই (এসিআর) একমাত্র মাপকাঠি। আদালত সূত্র জানায়, বর্তমান প্যানেলভুক্ত ১৪৮ জনের মধ্যে অন্তত ১০-১৫ জন বার্ষিক প্রতিবেদনের কারণে জেলা জজ না-ও হতে পারেন।
উল্লেখ্য মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে তৈরি করা বিধিতেই বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে সরকার পদোন্নতির শর্ত শিথিল করতে পারবে। বাস্তবে এর ঘন ঘন অনুশীলন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক বিচারক, যাঁরা প্রেষণে প্রশাসনিক কাজে আছেন, তাঁরাই এর সুবিধা ভোগ করছেন।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ফুলকোর্ট সভায় পদোন্নতি লাভ-পূর্ব দুই বছরের বিচারিক অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন মাত্র ছয় মাসের বিচারিক অভিজ্ঞতা থাকলেই প্রেষণে থাকা কোনো অতিরিক্ত জেলা জজের পক্ষে জেলা জজ হতে আর বাধা থাকবে না। জেলা জজ হতে বিচারিক সার্ভিসে ১৫ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু অনেকেই এই ১৫ বছরের মধ্যে একটা দীর্ঘ সময় প্রেষণে প্রশাসনিক চাকরি করেছেন।
পদোন্নতি ও বঞ্চনা: প্রশাসনসহ কিছু ক্যাডার সদস্যরা পদোন্নতি লাভের পর থেকে বর্ধিত হারে বেতন পান। পদোন্নতি সাপেক্ষে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করা পর্যন্ত সংশ্লিস্ট বিচারকেরা আগের স্কেলেই বেতন তুলতে বাধ্য হন। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের জুন-জুলাই মাসে ১৭১ জন যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত জেলা জজ পদে পদোন্নতি প্যানেলভুক্ত হন। এর মধ্যে গত ১৫ মাসে ১২২ জনের পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার মাধ্যমে পদোন্নতি কার্যকর হয়েছে।
বাকি ৪৯ জন কবে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে যোগ দেবেন, তা কারও জানা নেই। ওই সময়ে ৩৪৮ জন জ্যেষ্ঠ সহকারী জজকে যুগ্ম জেলা জজ পদেও পদোন্নতির প্যানেলভুক্ত করার বিষয়টি অনুমোদিত হয়। গত ১৫ মাসে ২১৭ জনের পদায়ন সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ১৩১ জনের পদোন্নতি কার্যকর হতে কত দিন লাগবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। পদ শূন্য না হলে কারও পদোন্নতি কার্যকর হবে না।
ভিনদেশ ও তুলনা: সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন বলছেন, প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন হাইকোর্টের অনুসৃত রীতিনীতির আলোকেই বাংলাদেশের পথচলা সমীচীন। পদোন্নতি ও বদলি বিষয়ে কলকাতা, এলাহাবাদ, রাজস্থান, ছত্তিশগড় ও গুয়াহাটি হাইকোর্ট এবং কেনিয়ার সুপ্রিম কোর্টের তৈরি করা নীতিসমূহের বিস্তারিত এই প্রতিবেদক তাঁর কাছে তুলে ধরলে বিচারপতি এম এ মতিন এসব নীতি বাংলাদেশের বাস্তবতায় অনুসরণযোগ্য বলে মত দিয়েছেন।
বিচারপতি এম এ মতিন আরও বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত খেয়ালিপনা নিবৃত্ত করার জন্য নীতি থাকা দরকার। ব্যক্তি নয়, নীতি রাজত্ব করবে। আইনের শাসন প্রত্যাশিত, ব্যক্তি-শাসন নয়।’
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে তাঁদের পূর্বসূরি মনে করেন। ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ কলকাতা হাইকোর্টের সিলেকশন বোর্ড কর্মরত বিচারকদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে ৪৫ জন অতিরিক্ত জেলা জজের নাম প্রকাশ করেছেন। তবে শর্ত দেন যে, শীর্ষ ১৫ মেধাবী ২০১৭ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে জেলা জজ (প্রবেশ পর্যায়) পদ শূন্য হওয়া সাপেক্ষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কর্মস্থলে যোগ দেবেন।
এতে দেখা যায়, চাকরিতে যাঁরা জ্যেষ্ঠ তাঁরাও মেধার প্রতিযোগিতায় কনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছে পিছিয়ে পড়ছেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় ৪০ জনের নিচে থাকা চারজন উঠেছেন শীর্ষ চারে। কলকাতা হাইকোর্টে প্রধান বিচারপতি ও অপর দুজন হাইকোর্ট বিচারপতি বিচারকদের এসিআর মূল্যায়ন করে ৩৫ এবং মৌখিক পরীক্ষার ১৫ নম্বর দেন।
বিচারকদের দেওয়া রায় মূল্যায়ন করে গড়ে ৫০ নম্বর দেন হাইকোর্টের অন্য তিন বিচারপতি। কে কত দিলেন তা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পদ শূন্য হওয়ার অনেক আগেই এই প্যানেল চূড়ান্ত করা হয়, যাতে পদোন্নতি বা অবসরজনিত বা কোনো কারণে জেলা জজের পদ শূন্য না থাকে।
বাংলাদেশে সহকারী জজ, সিনিয়র সহকারী জজ ও যুগ্ম জেলা জজদের ১০০ নম্বরের এসিআর লেখেন জেলা জজ। অতিরিক্ত জেলা জজদের ৪০ নম্বর লেখেন জেলা জজ এবং ৬০ নম্বর লেখেন হাইকোর্টের বিচারপতি। জেলা জজদের ১০০ নম্বরই দেন হাইকোর্ট বিচারপতি। কিন্তু এর কোনো প্রক্রিয়াতেই বিচারপতি-জেলা জজ পরস্পর সাক্ষাৎ ঘটে না। এসিআরে প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে ‘অসাধারণ, খুব ভালো, ভালো, চলতি মান ও চলতি মানের নিম্নে’ মর্মে রেটিং করা হয়।
দিল্লি হাইকোর্টের ২০১১ সালের আগে নিয়ম ছিল অতিরিক্ত জেলা জজ থেকে জেলা জজ হওয়ার পরীক্ষার সময় গত পাঁচ বছরের কর্মকালে একটি এ গ্রেড থাকতে হবে। ২০১১ সালে এই রীতি কঠোর করে শর্ত দেওয়া হয়েছে, একাদিক্রমে পাঁচ বছর এ গ্রেড থাকতে হবে।
বিচার বিভাগের বহু মেধাবী বিচারক এই দুঃখ চেপে রাখেন যে, তাঁরা কখনো রাজধানী বা তার আশপাশে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন না করেই অবসরে যান। ভারতে অঞ্চলভিত্তিক দায়িত্ব পালনের রীতি রয়েছে। বাংলাদেশে এই রীতির প্রচলন হওয়ার দরকার বলে মনে করেন বিচারপতি এম এ মতিন।
বাংলাদেশের বদলি ও কর্মস্থল নির্ধারণে বিচারকের স্থায়ী ঠিকানাকে প্রধানত বিবেচনায় নেওয়া হয়। চট্টগ্রাম বিভাগে যাঁদের বাড়ি, তাঁদের প্রধানত চট্টগ্রামেই (নিজ জেলা ছাড়া) বদলি করা হয়ে থাকে। বদলির প্রস্তাবে বিচারকের পৈতৃক বাড়ি উল্লেখ থাকলেও শ্বশুরবাড়ির কথা থাকে না। ফলে শ্বশুরবাড়ির এলাকায় বিচারকের পদায়ন ঘটার একাধিক নজির আছে।
বর্তমানে যেসব বদলির প্রস্তাব সুপ্রিম কোর্টে আছে, তাতে কয়েকটি ক্ষেত্রে ছয় মাসও বদলি হয়নি কিন্তু স্বামী বা স্ত্রীর একজনের বদলির কারণে আরেকজনের বদলির প্রস্তাব করা হয়েছে। এটাও সব সময় সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।
উল্লেখ্য ভারতের রাজস্থান হাইকোর্টের নীতিমালা বলছে, কেউ একাদিক্রমে দুই মেয়াদ হাইকোর্টে বা সরকারের কোনো পদে প্রেষণে কাটালে আবার তাঁকে কোনো বিচারবহির্ভূত পদে পদায়নের আগে কোনো বিচারিক পদে অবশ্যই ন্যূনতম দুই মেয়াদ চাকরি করতে হবে। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো নীতি নেই।
২০১২ সালে ভারতের গুজরাট হাইকোর্ট তাঁর নীতিমালায় একই স্থান ও একই পদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করেন। অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ শফিকুল ইসলাম তালুকদার স্মরণ করেন, আশির দশকে চাকরিতে ঢুকেও তাঁরা দেখেছেন, একবার শহরে বদলি হলে পরের বদলি হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। গুজরাটের নিয়ম হলো, একই পদের বিপরীতে হোক বা না হোক, কেউ একই স্থানে (গুজরাটেও তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চল আছে) তিন বছরের বেশি মেয়াদে চাকরি করতে পারবেন না।
বার্ষিক বদলির দুই মাস আগে সংশ্লিষ্ট বিচারকের কাছে বিকল্প কর্মস্থল চাওয়া হবে এবং তা যত দূর সম্ভব রক্ষা করা হবে। বদলির আগে কোনো তদবির চলবে না। বদলি করা স্থানে যোগদানের ১৫ দিনের মধ্যে পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যাবে। বার্ষিক বদলির আগে যথানিয়মে কাঙ্ক্ষিত স্থানে বদলির প্রস্তাব দেওয়া বা পরে পুনর্বিবেচনার জন্য দরখাস্ত ছাড়া অন্য যেকোনো উপায়ে কোনো বিচারক পছন্দের স্থানে বদলির অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে তা গর্হিত বলে গণ্য হবে। বাংলাদেশে দ্বৈত শাসনের কারণে এ ধরনের নিয়ম কার্যকর হতে পারছে না।
প্রেষণ: বিচারিক কাজের চেয়ে প্রেষণে মন্ত্রণালয় বা সুপ্রিম কোর্টে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ঢাকায় থাকতে আগ্রহী বিচারকদের মধ্যে উদ্দীপনা দেখা যায়। কিন্তু এ জন্য কোনো নীতিমালা নেই। অলিখিত নিয়ম হলো উচ্চপর্যায়ের যখন যাঁকে ইচ্ছা, তাঁকেই তাঁরা সুপ্রিম কোর্টে বা মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিতে পারেন।
ভারতের ছত্তিশগড় হাইকোর্টের ২০১৩ সালের বিধি প্রেষণে থাকার মেয়াদ চার বছর এবং বিশেষ প্রয়োজনে আরও এক বছর নিশ্চিত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে কোনো নিয়ম নেই। উপরন্তু প্রেষণে থাকার ফলে বিচারিক কাজে দায়িত্ব পালনের ঘাটতি বিধি সংশোধন করে মিটিয়ে পদোন্নতি দেওয়ার নজির রয়েছে।
উল্লেখ্য প্রেষণে আইন মন্ত্রণালয়ে ৩৮ জন বিচারক কর্মরত থাকতে পারেন। আটজনের পদ শূন্য আছে। এর মধ্যে সলিসিটর উইংয়ে ছয়টি ও প্রশাসনে দুটি পদ খালি আছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, এসব পদ পূরণে সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের প্রস্তাব পড়ে আছে। সুপ্রিম কোর্টে এর আগে প্রেষণে ১২ জন কর্মকর্তা কর্মরত ছিলেন, সম্প্রতি তা ২১ জনে উন্নীত হয়।(সূত্র প্রথম আলো)





