সময়টা ১৯৭২, ৭ ফেব্রুয়ারি। কলকাতায় এক নাগরিক সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধু বলেছেন, বাংলাদেশের মুক্তির পর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে একজন অবাঙালিকেও হত্যা করা হয়নি। কলকাতা সফরে এদিন (৭ ফেব্রুয়ারি) বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন তিনি। তিন দফা বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এই দুই দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব আন্তর্জাতিক প্রশ্নে পূর্ণ মতৈক্যে পৌঁছান।
এদিকে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর প্রধান খান আব্দুল ওয়ালী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানান। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে খান আব্দুল ওয়ালী বলেন, ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেই জনাব ভুট্টো যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে পারবেন।’
বদলা নিতে একজন অবাঙালিকেও হত্যা করা হয়নি: বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন, বাংলাদেশে সব মতাবলম্বী লোক সমান অধিকার ভোগ করবেন। রাজ ভবনে কলকাতা করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ যে চারটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তার অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে ধর্ম নিরপেক্ষতা। তার সরকার বিভিন্ন মতাবলম্বী লোকের মধ্যে কোনও পার্থক্য করবে না।’ শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তির পর একজন অবাঙালিকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করতে গিয়ে হত্যা করা হয়নি।’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবার বর্বর পাক বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হওয়া সত্ত্বেও মুক্তিবাহিনী কখনও প্রতিশোধ গ্রহণের চেষ্টা করেনি। যদি চাইতো তবে বাঙালি হত্যার ব্যাপারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতাকারী সব অবাঙালিকেই তারা ১৬ ডিসেম্বরে খতম করে দিতে পারতো।’
তবে তিনি বাংলাদেশে বসবাসকারী অবাঙালিদেরকে স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘যদি তারা তাই করে তবে আমাদের মতো তারাও হবে বাংলাদেশের নাগরিক।’ তিনি বলেন, ‘তাদেরকে এখানে অবশ্যই বাঙালি হিসেবে বসবাস করতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু বলেন যে, তিনি অথবা মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা কেউই প্রতিশোধ গ্রহণে বিশ্বাস করেন না। কাজেই বাংলাদেশে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। বঙ্গবন্ধু দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘কতিপয় মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, অবাঙালিদের ওপর নির্যাতন চলছে এবং তারা সংবাদপত্রে মিথ্যা ও দুরভিসন্ধিমূলক বিবৃতি দিচ্ছে।’
মুজিব-ইন্দিরা পূর্ণ সমঝোতা
বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দুই দফা বৈঠকে মিলিত হন। তৃতীয় ও শেষ বৈঠক শেষে নয়াদিল্লি যাওয়ার প্রাক্কালে মিসেস গান্ধী দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনা অত্যন্ত সন্তোষজনক।’ এদিকে বাংলাদেশ সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, আলোচনা অত্যন্ত দরকারি ও ফলপ্রসূ ছিল। দুই দেশের সব মূল ও প্রধান প্রশ্নে মতৈক্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক, বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। অধিকাংশ সময়ই শুধু দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে তাদের সাহায্যকারী হিসেবে বৈঠকে যোগদান করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ ও ভারতের শিক্ষামন্ত্রী শ্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়। তারা বাংলাদেশ ও ভারত জড়িত রয়েছে এরকম সমস্যা সম্পর্কে দুই দেশের একটি যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি উদ্ভাবন করেন।
এএইচ





