মানুষের জীবনকে সুস্থ, সুন্দর এবং স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার ক্ষেত্রে যে কয়টি নিয়ামক, বিষয় বা বস্তু বাধা সৃষ্টি করে কিংবা জীবনকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় তার মধ্যে মদ বা মাদকদ্রব্যসমুহ হচ্ছে অন্যতম। একজন ব্যক্তি যখন মদপান করে তখন এর প্রভাব শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ইহা সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে এক সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক ফলাফল বয়ে নিয়ে আসে।
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন “হে ঈমানদারগণ! মদ,জুয়া,মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানী কার্যকালাপ। অতএব এগুলো থেকে দূরে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে” ( সূরা আল-মায়িদাহ- ৯০)।
আলোচ্য আয়াতের মধ্যে দিয়ে মদ, মদ্যপান এবং মদের সাথে সম্পৃক্ত সকল কাজকে নিষিদ্ব করা হয়েছে। কুরআনে মদের আরবী শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ‘খামরু’ বা ‘খিমার’ শব্দটি যার অর্থ আবৃত করা, আচ্ছাদিত করা বা ঢেকে ফেলা।
হযরত ওমর ফারুক (রাঃ) বলেন- “মদ হচ্ছে তাই,যা মানেুষর বিবেক বা বোধশক্তিকে আচ্ছন্ন করে ফেলে বা বিবেককে ঢেকে দেয়” (বুখারী -৪৬১৯)। আর বিবেক হচ্ছে সেই জিনিষ যা ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ধারণে সহায়তা করে। অতএব মদ্যপানের ফলে বিবেক যখন আচ্ছন্ন হয়ে যায় তখন মানুষ যেকোন ধরনের অন্যায়, অশ্লীল ও মন্দ কাজ করতে পারে এবং এতে সে বিন্দুমাত্র দ্বিধান্বিতবোধ করে না।
মদ এক ধরনের নেশা জাতীয় বস্তু। মানুষ প্রবৃত্তির তাড়নায় বিভিন্ন নেশায় লিপ্ত হয় যা মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে রুপ নেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই অভ্যাসগত জিনিষ ত্যাগ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। নবী (সাঃ) বলেন, যা নেশা সৃষ্টি করে তাই মদ,আর যা নেশা সৃষ্টি করে তাই হারাম। (মুসলিম ৫০৪৯,তিরমিযী ১৮৬৭)। এ সম্পর্কে হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে যে  নবী করীম (সাঃ) বলেছেন: সব নেশা যাতীয় পানীয়ই হারাম। (বুখারী ৫১৭২,মুসলিম ৫০৪১)।
এছাড়া পবিত্র কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- “শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে৷ তাহলে তোমরা কি এসব থেকে বিরত থাকবে না?” (সূরা আল মায়িদাহ-৯১)।
অতএব এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে মদ ও মদ্যপানকারীর আচরনের কুপ্রভাবে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের বৈরিতা সৃষ্টি করে যার ফলে পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা, কলহ-বিবাদ ও হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। তাছাড়া আর্থসামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে সমাজের মধ্যে যে বড় বড় অপরাধগুলো যেমন খুন, ছিনতাই, রাহাজানি, ধর্ষণ ইত্যাদি সংগঠিত হয়, তার সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তের সাথে জড়িত।
ইসলাম শুধুমাত্র মদ বা মদ্যপানকে নিষিদ্ব করেই ক্ষান্ত থাকেনি বরং মদের সাথে সম্পৃক্ত সকল কাজকে কঠোরভাবে নিষিদ্ব করা হয়েছে। কেননা মদের উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত কোন একটি স্তর সক্রিয় থাকলে তা পুনারায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারায় নিয়ে আসতে পারে যা পরিনামে বিপর্যয় ডেকে আনবে।
আর এ প্রসঙ্গে হাদিসে বর্ণনা এসেছে যে “হযরত আনাস (রাঃ) বলেন- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদের সাথে সম্পৃক্ত দশ ব্যক্তিকে লানত করেছেন। (১) মদ প্রস্তুতকারী (২) মদের ফরমায়েশ দানকারী (৩) মদ পানকারী (৪) মদ বহনকারী (৫) যার প্রতি মদ বহন করা হয় (৬) যে মদ পান করায় (৭) মদ বিক্রেতা (৮) মদের মূল্য ভোগকারী (৯) মদ ক্রয়কারী (১০) যার জন্য মদ ক্রয় করা হয়” (তিরমিযী,ইবনে মাজাহ)।
মদ্যপান ও মাদকদ্রব্য সেবন সাস্থ্যের জন্য অনেক সময় জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি করে যা আমাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। আল্লাহ তা’আলা হলেন আমাদের জীবনের মালিক এবং মানুষ হিসেবে আমদের জীবনকে ধবংসের দিকে ঠেলে দেয়াকে আল্লাহ তা’আলা সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করে দিয়েছেন।
আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন- “তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না” (সূরা বাকারা- ১৯৫)।
আর মদপান যেহেতু চূড়ান্ত পরিনতি হিসেবে ধীরে ধীরে আত্মহননের দিকে ধাবিত করে, তাই মদপান এই দৃষ্টিকোণ থেকেও হারাম।
জীবনকে ধ্বংস করার পাশাপাশি মদ আমাদের পরকালীন জীবনের প্রধান মূলধন যার উপর ভিত্তি করে জান্নাত-জাহান্নাম নির্ণীত হবে অর্থাৎ সেই ঈমানেক ধ্বংস করে দেয়।
হযরত আবূ হুরাইরা (রাঃ)থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেন কোন মদপানকারী মদ পান করার সময় ঈমানদার থাকেনা। (বুখারী-৬৩০২)।
অতএব কেও যদি মদ্যপান অবস্থায় মৃত্যু বরণ করে তাহলে সে যেন বেঈমান হয়ে ইহকাল ত্যাগ করল।
তবে অনান্য পাপের পথ ও মন্দ কর্ম থেকে ফিরে আসার জন্য তাওবার মাধ্যমে ইসলাম যেমন পুনারয় মুমিন জীবনে প্রবেশ করার সুযোগ দেয় ঠিক তেমনি মদ্যপানের মত ঘৃণ্য পাপাচার থেকে ফিরে আসার জন্য তাওবার সুযোগ প্রদান করেছে।
হযরত উমর (রাঃ)হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাঃ)বলেছেন-“যে ব্যক্তি দুনিয়ার মদ পান করেছে এরপর সে তা থেকে তওবা করেনি সেই ব্যক্তি আখিরাতে তা থেকে বঞ্চিত থাকবে” (বুখারী-৫১৬২, তিরমিযী-১৮৬৭)।
তাছাড়া ইসলাম সমাজের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে মদ্যপানের প্রতি কঠোরতা আরোপ করেছে এবং পরকালীন জীবনে কঠিন শাস্তি নিরধারন করে রেখেছে। অতএব একটি কল্যাণময় জীবন-যাপনের জন্য সকলের উচিৎ মদ্যপান এবং মদের কারবার সংক্রান্ত সকল কাজকে পরিহার করা।
[b]লেখক: শেখ আব্দুল্লাহ-আল-নকী, শিক্ষার্থী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ(৪র্থ বর্ষ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।[/b]