প্রতিনিধিত্বমূলক ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে পড়েছে সরকার। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সহায়ক ভরসার স্থল ভারত সরকারের বদলও এ চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। কংগ্রেসের মত দলটির পাশে থাকছে না বিজেপি। ‘মার্কিন বার্তায় চাপে সরকার’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তরের বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আরও প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় নয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বার্তায় চাপের মুখে পড়েছে সরকার।

এর আগে এ ধরনের চাপে ভারতের কংগ্রেস সরকার পাশে দাঁড়ালেও এবার নতুন বিজেপি সরকার পাশে থাকছে না। ভারত তাদের জাতীয় বাজেটে বাংলাদেশের জন্য ৪০ শতাংশ বরাদ্দ কমিয়ে পাশে না থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। এ অবস্থায় কূটনৈতিক মহল থেকে ফের সংলাপের চাপ আসতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া বার্নিকাট সিনেটে শুনানিতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে আরও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনে সংলাপ অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছেন। ড্যান মজিনাসহ উন্নয়ন সহযোগীরাও এ ধরনের কথা বলেছেন। কিন্তু সরকার গুরুত্ব দেয়নি। কারণ কংগ্রেস আমলে ভারতের কাছ থেকে নির্বাচনের পক্ষে সমর্থন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। ভারতে ক্ষমতার পালাবদলের পর সমর্থনের হাওয়া পরিবর্তন হয়েছে।

ভারতের বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়া যে তারই বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন অনেকেই। বাংলাদেশ সরকারের ওপর থেকে ভারতের সমর্থন কমলে বা প্রত্যাহার হলে মার্কিনসহ অন্যদের চাপ সামাল দেয়া সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করেন কূটনীতিক, রাজনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান এ পত্রিকাকে বলেন, মার্কিন সিনেটে শুনানিতে বাংলাদেশের জন্য মনোনীত রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন তা বাংলাদেশের জন্য কঠিন বার্তা। মার্কিন সিনেটের শুনানিতে ওয়াশিংটনের অবস্থান জানার জন্য মনোনীত রাষ্ট্রদূতকে এ ধরনের প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রদূতের উত্তরে মার্কিন সরকারের অবস্থানের প্রতিফলন ঘটে থাকে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি যে একতরফা নির্বাচন হয়েছে এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিলে অন্যান্য দেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মেনে নেয়া সম্ভব হবে না।

আশফাকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কাছে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা এবং পরবর্তী সরকারের পক্ষে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্যই সম্মেলনে অংশ নিতে যুক্তরাজ্য সফরে গেছেন। এই সম্মেলনে স্বাগতিক দেশ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো দেশের সরকারপ্রধান যাননি। এতে বোঝা যায় যে, শেখ হাসিনা তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করতেই এই সম্মেলনে গেছেন। তিনি কতটা সফল হয়েছেন জানি না। তবে সবাই একটা আলাপ-আলোচনা শুরু করতে চাইবে বলে মনে হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলেন, নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত যা বলেছেন তা ওয়াশিংটনের অবস্থানের ধারাবাহিকতা মাত্র। এতদিন ড্যান মজিনা যা বলেছেন নতুন রাষ্ট্রদূতও সে কথাই বলেছেন। বাংলাদেশের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তিনি বলেন, আমি শুনেছি মনমোহন সরকার বাংলাদেশের জন্য যে মঞ্জুরি সহায়তার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল বর্তমান মোদি সরকার তা বাজেটে সমন্বয় করেছে।

বিজেপি সরকার বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে নাক গলাবে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরে এসে সে কথাই বলে গেছেন। সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী না হওয়া সত্ত্বে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। এটা মোদি সরকারের ভারসাম্যপূর্ণ নীতিরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের কংগ্রেস সরকারের সমর্থন থাকায় মার্কিন বিরোধিতার মুখেও বাংলাদেশ সরকার ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন করতে পেরেছে। ওই সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পরোক্ষভাবে নির্বাচনের বিরোধিতা করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোসহ উন্নয়ন সহযোগীরাও বিএনপিবিহীন নির্বাচনে বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু সরকারকে দমাতে পারেনি কেউ। তবে সমপ্রতি ভারতে কংগ্রেস সরকারের পরিবর্তন হয়েছে।

খুব ধীরে হলেও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ওপর থেকে মোদি সরকারের সমর্থন কমতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের জন্য ৪০ শতাংশ বরাদ্দ কমিয়ে তার প্রমাণ দিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রটি। অন্যদিকে বাংলাদেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতও পরিবর্তন হচ্ছে। তবে নতুন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে আসার আগেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ত্র“টিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন। এক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রদূত তার পূর্বসূরির পথ অনুসরণ করবেন এটা স্পষ্ট। শক্তিশালী দুটি রাষ্ট্র কাছাকাছি সময় বাংলাদেশকে আলাদাভাবে যে বার্তা দিয়েছে তা নিয়ে সরকার যে চাপে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য সরকারও নানা ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

সরকারের নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে মাঠে নেমেছে সরকার। তার অংশ হিসেবে লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে তার দেশের নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন। এছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন।

নয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাটের গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলার পর নতুন করে চাপের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনের পর পর একই ধরনের চাপ পশ্চিমারা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু ভারতের বিদায়ী কংগ্রেস সরকার নির্বাচনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়ায় ওই সময়ে সাময়িকভাবে চাপমুক্ত হয় শেখ হাসিনার সরকার। ভারতে কংগ্রেস বিদায় নেয়ার পর বর্তমান বিজেপি সরকার খানিকটা নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে পারে। বিজেপি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ও বিএনপি উভয়েই সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বার্নিকাটের এই বক্তব্যে সরকারের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী দেশের মানুষের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। অথচ নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে না এসেই আমেরিকায় বসে বাংলাদেশের নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলেছেন। উনি কি নির্বাচন স্বপ্নে দেখেছেন? কূটনীতিকদের মনে রাখা উচিত এটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এদেশের ভবিষ্যৎ এদেশের মানুষই নির্ধারণ করবে। শেরপুরে নিজের নির্বাচনী এলাকায় মঙ্গলবার তিনি এসব কথা বলেন।

ভারতের বাজেটে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেয়ার বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে দেয়া এক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মনমোহন সরকার ২০১০ সালে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরকালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, বাংলাদেশকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দেবে। তারপর ২০১২ সালে সেই ঋণের ২০ কোটি ডলার মঞ্জুরি ঘোষণা করে। ফলে অবশিষ্ট ৮০ কোটি ডলার ঋণ হিসাবে থেকে যায়। ভারতের ব্যাখ্যায় বলা হয়, মঞ্জুরি সহায়তার ১৫ কোটি ডলার ইতিমধ্যেই ছাড় করা হয়েছে। প্রতিশ্রুত সহায়তা নির্ধারিত সময়ে দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় বরাদ্দ বাজেটে সমন্বয় করা হয়েছে।

এদিকে পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছে। তবুও তারা বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে কানাডার হাইকমিশনার হিদার ক্রুডেন যুগান্তরকে বলেন, যদিও আমরা নির্বাচনকে পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক বলে মনে করি না, তবুও আমরা সরকার, বিরোধী দলসমূহ, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে কাজ করে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখব। কানাডার এই কূটনীতিক রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংলাপে বসার এখনই সময়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানা বলেন, দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসতে কূটনীতিকদের তরফ থেকে নতুন করে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর কিছুটা বিরতি দিয়ে কূটনীতিকরা সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে ফের তৎপর হয়ে উঠছেন। বিদেশী কূটনীতিকদের সামপ্রতিক কথাবার্তায় এমন আভাসই পেয়ে তা মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে।

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া ঈদের পর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে সৌদি আরব সফরে গেছেন। সেখানে পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। আন্দোলনের লক্ষ্যে বিএনপি দল এবং বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন পুনর্গঠন শুরু করেছে। সরকারবিরোধী এই আন্দোলনে কূটনীতিকদের সহমর্মিতা পেতে কৌশল খুঁজছে বিএনপি।সূত্র:বিডিটুয়েন্টিফোরলাইভ

ঢাকা, ২৫ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ