৫ই জানুয়ারী- ২০১৪ এ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহন নিশ্চিত না হওয়ায় তা বর্জন করেছে বিএনপি। এ নির্বাচনকে ঘিরে আগে ও পরে সংগঠিত হয়েছে যত হানাহানি ও মারামারি। এতে হূমকির মুখে পড়েছে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রয়োগ। আর এরই ধারাবাহিকতায় দাবি ওঠে মধ্যবর্তী নির্বাচনের।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, সাংবিধানিকভাবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাসমূহ থেকে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী নির্বাচিত ৩০০ সদস্য নিয়ে সংসদ গঠিত হবে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনে এর কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের অনুসারী দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি মিলিয়ে ১২টি দল নির্বাচন করেছে। তাতে ১৫৩টি আসনে প্রত্যক্ষ কোনো নির্বাচন হয়নি। এসব আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

দেশের মানুষ এ নির্বাচনকে গ্রহণ করেছে বলে আমি মনে করি না। রাজনৈতিক সংকট নিরসনের একমাত্র উপায় মধ্যবর্তী নির্বাচন। তা না হলে সংঘাত আরও বাড়বে। (সূত্র : প্রথম আলো)

রোববার (২৬ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ন্যাপ-ভাসানীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মানববন্ধনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ-ভাসানী) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করা হলে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গড়া সম্বব হবে। বিচার বিভাগকে প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করছে বর্তমান সরকার।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। যদিও সরকারি দলের তরফ থেকে ২০১৯ সালের আগে জাতীয় নির্বাচনের সম্ভাবনা বার বারই উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। তা সত্ত্বেও সরকারের ভেতর থেকেই একটি মহল মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে চলা এ গুঞ্জনের পালে হাওয়া দিয়ে যাচ্ছে।

এর মাধ্যমে একদিকে ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে গণতন্ত্রের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ ও দেশে পরোক্ষভাবে চাপে থাকা ক্ষমতাসীন সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাব্যতা নিয়ে নানাভাবে মাঠ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগে পাচ্ছে। অন্যদিকে ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন দিলে কী লাভ বা ক্ষতি হতে পারে, তাও বোঝার চেষ্টা করছে।

এ সব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণে মধ্যবর্তী নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার পাল্লা ভাড়ি হলে ক্ষমতা স্থায়ী করতে কি করতে হবে সেটাও ভেবে রেখেছে সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে ‘একতরফা’ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর থেকে সরকারের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি বিরাজ করছে।

উন্নয়ন সংস্থা ও প্রভাবশালী দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিনিয়ত নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে তারা। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক শাসন প্রশ্নে প্রভাবশালী দেশগুলোর অবস্থান না বদলানোয় অস্বস্তি কাটছে না।

প্রভাবশালী দেশগুলো বারবার বলছে, বিগত ৫ জানুয়ারি কোনো নির্বাচন হয়নি। সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন হলেই কেবল রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট গত ২ জুলাই বলেই দিয়েছেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বদলায়নি।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু হওয়া প্রয়োজন। দলগুলো চাইলে এই আলোচনার উদ্যোগ নিতে রাজি আছে যুক্তরাষ্ট্র।’

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রভাবশালী দেশগুলো বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার দেখতে চায়। যে নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নেবে এবং বাংলাদেশের মানুষ তাদের পছন্দের সরকার নির্বাচন করতে পারবে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন দিতে এখনো পর্যন্ত রাজি নয় আওয়ামী লীগ সরকার। তবে পরিস্থিতির আলোকে নির্বাচন দিতে হতে পারে, এমন সম্ভাবনার দিকটি মাথায় রেখে বিএনপিকে ঘিরে নানা তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।

বর্তমান সংবিধানেই মধ্যবর্তী নির্বাচন হওয়া সম্ভব। স্বাধীনতার পর আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় তিন তিনবার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচন মানেই জাতীয় সংসদের নতুন নির্বাচন।

বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের আওতায় মেয়াদপূর্ণ হওয়ার আগেই তৃতীয় সংসদ ভেঙে ১৯৮৮ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

চতুর্থ সংসদের মেয়াদপূর্তির আগেই সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৯১ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

আর সর্বশেষ ষষ্ঠ সংসদের মেয়াদ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সংসদ ভেঙে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালে প্রথম শপথ নিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমেই ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম শপথ নিয়েছেন শেখ হাসিনা।

শনিবার(২৫ জুলাই) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি জানান।

এদিকে, আগাম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই ১৪দলীয় জোটের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। বিএনপির এই দাবিকে সরকার কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকার বা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে কোনো আলোচনাও নেই।

বাংলাদেশ সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, বিজয় সুনিশ্চিত বুঝলেই সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে।

সাবেক এ সেনা শাসক মনে করেন, বর্তমানে এমন কোনো ইস্যু বিএনপি সৃষ্টি করতে পারেনি যার জন্য সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য।

তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে ব্যর্থ। লতিফ সিদ্দিকী ইস্যুতে তারা কোনো কর্মসূচিই দিতে পারেনি।

এরশাদ পাল্টা প্রশ্ন করেন, সরকার বাধ্য না হলে কি এমনি এমনি আগাম নির্বাচন দেবে? আন্দোলন-সংগ্রাম না হলে সরকার কখনোই মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে না। বিএনপি এখন বেকায়দায়।

আওয়ামী লীগ কি নিজে থেকে নির্বাচন দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাতে যাবে? (সূত্র: ৫ অক্টোবর-২০১৪, রেডিও তেহরান)

এমকে