গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন কারাগারে যাওয়ার পর তাকে মুক্ত করতে তার ঘনিষ্টজন ও সমর্থকরা নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে। অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন মহলের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা ও ক্যাডার বাহিনীর প্রভাব কাজে লাগিয়ে সুন্দরগঞ্জে লিটনের জনপ্রিয়তা প্রমাণে তাদের চেষ্টার কমতি নেই।

গত সোমবার ষষ্ঠীর সন্ধ্যা থেকে সুন্দরগঞ্জের বিভিন্ন মন্দির ও পূজা মন্ডপে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ সুন্দরগঞ্জ উপজেলা শাখার নামে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তি চাই’ শ্লোগান সম্বলিত একটি ব্যানার টানানো হয়েছে। এতে সুন্দরগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায় বিষ্মিত হয়েছে।

বিভিন্ন মন্দির ও পূজা মন্ডপের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রাতে কে বা কারা ওই ব্যানার লাগিয়েছে তা তাদের জানা নেই। তারা চান ব্যানার লাগানো কিংবা তুলে ফেলার ব্যাপারে যারা কাজটি করেছেন সিদ্ধান্তও তারাই নেবেন।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন সন্ত্রাস ও নাশকতা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব বিষ্ণুরাম রায় বলেন, শিশু সৌরভকে গুলি করে আহত করার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এটি এখন আদালতের এখতিয়ার। সেখানে পূজা উদযাপন পরিষদের মত একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ব্যানার টানানোর ব্যাপারটি বোধগম্য নয়। এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি দীপক কুমার সরকার বাবলুর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, পরিষদের নামে কারা ব্যানার টানিয়েছে তা তার জানা নেই। তবে মন্দির কমিটি মনে করলে ব্যানার নামিয়ে নিতে পারেন মর্মে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।  

এর আগে গত রোববার তার নেতৃত্বে পূজা উদযাপন পরিষদের ব্যানারে এমপি লিটনের মুক্তি দাবি করে মানববন্ধন, মিছিল ও প্রধানমন্ত্রী বরাবরে লেখা একটি স্মারকলিপি দেওয়ার ব্যাপারে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক দীপক কুমার পাল বলেন, চলমান আইনি প্রক্রিয়ায় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালিত হচ্ছে। পূজা উদযাপন পরিষদ অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সুন্দরগঞ্জে এমপির পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য কেন্দ্র বা জেলা কমিটি থেকে কেউ কোন অনুমতি নেয়নি এবং নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি রণজিৎ বকসী সূর্য্য বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তবে এমপি লিটনের পক্ষে প্রচারণা চালানোর জন্য সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কমিটির কেউ জেলা নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেনি। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের এক নেতা জানান, যেখানে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে আইনী প্রক্রিয়া চলমান সেখানে এ জাতীয় দাবি নিয়ে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের নাম ব্যবহারের বিষয়টি উদ্দেশ্য প্রণোদিত। আমরা নিজস্ব ফোরামে বিষয়টি তুলে এর ব্যাখ্যা চাইবো।

এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক লোকজন জানান, গত রোববার সুন্দরগঞ্জের মন্দির ও মন্ডপের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন উপজেলা সদরে সরকারের দেওয়া খয়রাতি বরাদ্দের মন্দির ও মন্ডপ প্রতি ৫০০ কেজি করে চাল উত্তোলন করতে আসেন। ওইসব সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে মানববন্ধনসহ অন্য কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূজা উদযাপন পরিষদের এক নেতা বলেন, পুজা উদযাপন পরিষদের ব্যানারকে কাজে লাগিয়ে এমপি লিটনের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত সাবেক পৌর কমিশনার দীপক কুমার সরকার বাবলুর ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম বলেন, দলীয় হাই কমাণ্ডের নির্দেশের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আপাততঃ আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করে আদালতের ওপর আস্থা রেখেছি। আমরা বিশ্বাস করি নিস্পাপ শিশু সৌরভ ন্যায় বিচার পাবে। কিন্তু পূজা উদযাপন পরিষদের নাম ব্যবহার করে এমপি লিটনের মুক্তি দাবি করা ব্যক্তি বিশেষের স্বার্থ হাসিল ছাড়া আর কিছু নয়। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য মতে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় পৌর এলাকাসহ ১৫টি ইউনিয়নে এবার ১২১টি মন্দির ও মন্ডপে দুর্গা পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২ অক্টোবর শুক্রবার ভোরে মাতাল অবস্থায় এমপি লিটন শিশু শাহাদত হোসেন সৌরভ (৯) কে গুলি করেন। তার বিরুদ্ধে মামলা হলে গত বুধবার ঢাকায় তাকে গ্রেফতার করে বৃহস্পতিবার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আমলী আদালতে হাজির করা হয়। পরে আদালত তার জামিনের আবেদন না মঞ্জুর করে তাকে জেলা কারাগারে পাঠান। শিশু সৌরভকে গুলি করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমপি লিটনের শাস্তির দাবিতে সুন্দরগঞ্জে আন্দোলন শুরু হয়। এমপি লিটনের অনুসারি ও সমর্থকরাও এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানামুখী তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছেন।