স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, শুধু সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মোকাবেলা নয়, ভারত সবক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে প্রস্তুত রয়েছে।

দিল্লিতে বাসস প্রতিনিধি মাহবুবউল আলমের সাথে হোটেল তাজপ্লেসে একান্ত সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একথা বলেছেন।

দিল্লি সফরকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংসহ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সাথে অত্যন্ত সৌহার্দপূর্ণ এবং আন্তরিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষাৎকারে জানান।

মন্ত্রী জানান, এসব আলোচনায় মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে সকল দুর্যোগে ভারত যেমন বাংলাদেশের পাশে ছিল ভবিষ্যতেও সবক্ষেত্রে তেমনি আমাদের পাশে থাকবে বলে জানিয়েছে।

তিন দিনের সরকারী সফরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত ২৭শে জুলাই এক প্রতিনিধিদল নিয়ে দিল্লিতে যান। প্রতিনিধিদলে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান, পুলিশের আইজি শহীদুল হক, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের ডিজি রিয়ার এ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিজিবি’র ডিজি মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদসহ সিনিয়র সরকারী কর্মকর্তারা।

স্বরাষ্টমন্ত্রী আজ শনিবার দুপুরে জেট এয়ারওয়েজ-এর একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে দিল্লি ত্যাগ করেন।

সফর থেকে কতটুকু অর্জন হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, আমরা এখন মনে করছি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারত আমাদের পাশে রয়েছে।

তিনি বলেন, ভারত শুধু সাথে থাকবে না, প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে বলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্টমন্ত্রী আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন।

এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বলেন, বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই। জঙ্গীরা সবাই বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সন্ত্রাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যেভাবে উন্নয়ন এবং অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে তাকে প্রতিহত করতে এসব কিছু স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

গুলশান ট্র্যাজেডিকে একটি নতুন ধরনের সন্ত্রাসবাদী ঘটনা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদশে জঙ্গীবাদের বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা আগেও ছিল। অতীতে ৬৩টি জেলায় জঙ্গীরা একসাথে বোমা ফাটিয়েছে, বিচারকাজ পরিচালনার সময় বিচারকের উপর হামলা চালিয়ে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে, জেএমবি নামের জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের উত্থান আমারা অতীতে প্রত্যক্ষ করেছি। তবে সেসময় যারা বাংলাদশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল তারা এসব তৎপরতাকে উৎসাহ দিয়েছে এবং সহযোগিতা করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কখনও জেএমবি, কখনও হুজি অথবা বিভিন্ন নামে পরিচালিত জঙ্গী সংগঠনগুলো আসলে শিবির নেতাদের দ্বারাই পরিচালিত। এসব জঙ্গী সন্ত্রাসীদের দমনে আমরা যখন কঠোর ব্যবস্থা নিলাম তখন তারা যুদ্ধপরাধীদের বিচার বানচালে বিভিন্ন সন্ত্রাসী তৎপরতা শুরু করে। যুদ্ধাপরাধী সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার কথা বলে তারা সারাদেশ হত্যাযজ্ঞ চালায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা যখন তাদের সকল অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করলাম তখন তারা সারাদেশে একনাগাড়ে ৯০ দিন অগ্নি সন্ত্রাস চালায়। এই অগ্নি সন্ত্রাসে মানুষ এবং যানবাহন পোড়ানো থেকে শুরু করে কোন কিছুই বাদ যায়নি।

তিনি বলেন, সব সন্ত্রাসী তৎপরতা সফলভাবে দমন করার পর বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী বিশ্বে একজন নন্দিত নেতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ যখন একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে ঠিক তখনই বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্যে নতুন করে অপচেষ্টা শুরু হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, এই অপচেষ্টার অংশ হিসাবে ইতালীয় নাগরিক ট্রাভেলা সিজারকে হত্যা করা হয়। তারপর বনিও সুজিকে হত্যা করা হয়। এইভাবে হিন্দু মন্দিরের পুরহিত, খৃষ্টান ধর্মযাজক, নামাজরত অবস্থায় শিয়া মসজিদের মোয়াজ্জিন, বৌদ্ধ ধর্মালম্বীসহ ৩৫জনকে হত্যা করা হয়। এসব কিছুই করা হয় দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে। এসব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে সন্ত্রাসীদের মোকাবিলায় সফলতা অর্জন করলেন তখন এক নতুন মাত্রা শুরু হয়।

তিনি জানান, আগে জঙ্গীরা মাদ্রাসার কোমলমতি অবুঝ ছেলেদের সন্ত্রাসী তৎপরতার জন্যে ব্যবহার করতো। এখন তারা সমাজের শিক্ষিত এবং অবস্থাপন্ন পরিবারের মেধাবী ছেলেদের সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর জন্যে ব্যবহার করছে। সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর দেশে পরিণত করা।

কিন্তু জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দেশের জনগণ এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্যে গ্রামে গ্রামে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের দমন করাকে দেশের জনগণ একটি চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করেছে।

তিনি বলেন, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন জঙ্গী-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সফলভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে তখন জঙ্গী-সন্ত্রাসীরা নিজেরাই আইএস-এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে আইএস-এর কোনো সংগঠন নাই। স্থানীয় জঙ্গীরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আইএস-এর সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তারা মানুষকে আইএস-এর নামে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে মাত্র।

সূত্র : বাসস

এমআইএস