কুমিল্লার কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়েছে। সদ্য প্রকাশিত ডিএনএ পরীক্ষায় সেই আলামতই পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় তিন ঘাতকের বীর্য পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হল- কারা সেই ঘাতক? এখন অচেনা এই ঘাতকদের সন্ধানেই নেমেছে সিআইডি। দেড় মাসেরও বেশি সময়ে অনুসন্ধান এবং জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়বস্তু এবং তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখছে সংস্থাটি।

এদিকে সোমবার রাতে সিআইডি তনু হত্যার ডিএনএ রিপোর্ট প্রকাশের পর নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে তনুর পরিবার। তনুর বাবা-মায়ের বিশ্বাস সিআইডিই পারবে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করতে।

তিন ঘাতকের সন্ধানে সিআইডি : ডিএনএ রিপোর্টে তিন ঘাতকের বীর্যের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে এখন তাদের চিহ্নিত করতে মাঠে কাজ করছে সিআইডি। পরীক্ষায় মোট চারজনের ডিএনএ প্রোফাইল মিলেছে বলে সিআইডি সূত্র জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রোফাইল তনুর রক্তের। বাকি তিনটি প্রোফাইল পৃথক তিনজনের।

ডিএনএ পরীক্ষায় এ তিনজনের বীর্যের আলামত পাওয়া গেছে। সিআইডি বীর্যের প্রোফাইল ম্যাচিং করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু ডিএনএ নয় ময়নাতদন্তসহ সব রিপোর্ট একসঙ্গে করে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা হবে। সেনানিবাসের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে যেহেতু ঘটনাটি ঘটেছে তাই সব বিষয়ে ক্লিয়ার না হয়ে অপারেশনে যাবে না সিআইডি। তবে রহস্য উদ্ঘাটনের অনেকটা দ্বারপ্রান্তে পৌঁছা গেছে বলে দাবি করেছে সিআইডি।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার কুমিল্লাস্থ সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান যুগান্তরকে বলেন, তনুর ঘাতকদের সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য চেষ্টা অব্যাহত আছে। আরও বেশ কিছু সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে এবং তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং সংগ্রহকৃত আলামত দিয়েই প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হবে।

এ পর্যন্ত কতজনের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) সংগ্রহ করেছেন? এর মধ্যে কতজনের আঙুলের ছাপ ম্যাচিং হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাবে না। কিছু সন্দেহভাজনের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়া হয়েছে তনুর ডিএনএ’র সঙ্গে ম্যাচিং করে ঘাতক শনাক্ত করার জন্য। ড. নাজমুল আরও বলেন, ‘সন্দেহ এবং অনুসন্ধানের ভিত্তিতে আমরা শুরুতেই বলেছিলাম হত্যার মিশনে অংশ নেয় ৩-৪ জন। ডিএনএ প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে তাই প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি বলেন, চেষ্টায় কোনো ত্র“টি নেই, ঘাতকরা ধরা পড়বে ইনশাআল্লাহ।

এদিকে ডিএনএ রিপোর্টে তিন ধর্ষকের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে তনুর পরিবার। মঙ্গলবার তনুর মা আনোয়ারা বেগম, বাবা ইয়ার হোসেন ও ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল যুগান্তরকে বলেন, প্রথম ময়নাতদন্তে ধর্ষণ ও হত্যার কোনো আলামতই মেলেনি- ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের এসব কথা শুনে আমরা অনেকটা শংকিত ছিলাম। কিন্তু সোমবার জানতে পারলাম ডিএনএ প্রতিবেদনে অপরাধীদের অস্তিত্ব মিলেছে।

এখন আমরা বিচার পাওয়ার ব্যাপারে নতুন করে আশাবাদী হয়েছি। প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার মেয়েকে পরিকল্পিত ও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে কিন্তু তারা (ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক) হত্যার কোনো আলামত নেই বলে একটা রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, তনুর লাশের প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অযৌক্তিক। শিগগির দ্বিতীয় সঠিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, হত্যাকাণ্ডের প্রায় দু’মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ঘাতক শনাক্ত হয়নি। যে বা যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের বিচার ও শাস্তি চাই। আনোয়ারা বেগম আরও বলেন, ‘আমার ভেতরের কষ্টটা কাউকে দেখাতে পারছি না, কষ্টে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে। সোমবার সারা রাত পরিবারের কোনো সদস্যই ঘুমাতে পারিনি।’

তনু হত্যা মামলা নিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যা বললেন : আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তনু হত্যা মামলাটি বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে চাইলে আইন মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি অবশ্যই বিবেচনা করবে। মঙ্গলবার সকালে বিচার প্রশাসন ও প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের বিচারকদের আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

তনু হত্যা মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, মামলাটি তদন্তাধীন। এ অবস্থায় কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে তনু হত্যার ঘটনা দেশের জনগণকে বিচলিত করেছে। জনগণ এর সুষ্ঠু বিচার চায়।

উল্লেখ্য, ২০ মার্চ সোহাগী জাহান তনুকে হত্যার পর কুমিল্লা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাওয়ার হাউস এলাকার পাশের একটি জঙ্গলে লাশ ফেলে দেয় ঘাতকরা। পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবির পর সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনায় মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।সূত্র-যুগান্তর।

এমবি