তনুর ভাইয়ের বন্ধু সোহাগকে গতকাল পাওয়া যায় কুমিল্লার নাজিরাবাজারের বাসার কাছেই। মা-বাবার মাঝে থেকেও যেন আতঙ্ক কাটেনি তাঁর। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কখনো চোখ খোলা ছিল না তার। পিছমোড়া করে বাঁধা ছিল হাত।
একটি ঘরেই আটকে রাখা হয়েছিল তাকে। এর বেশি সে কিছুই জানে না। ১৬ দিন পর ফিরে এসে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী নিহত সোহাগী জাহান তনুর ভাইয়ের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগ এমন তথ্যই দিল।
স্বজনদের অভিযোগ ছিল, তনু হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কিছু লোক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় সোহাগকে। গতকাল ভোরে কুমিল্লার নারায়ণসার এলাকায় দেখা মেলে তার। কুমিল্লা সেনানিবাস সংলগ্ন ওই এলাকাতেই তনু হত্যার বিচারের দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিল সোহাগ।
গতকাল সকাল ৯টায় তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় অসুস্থ আর ক্লান্ত সোহাগের চোখে-মুখে রাজ্যের শঙ্কা। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিল না সে। গত ২৭ মার্চ রাতে সোহাগকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকেই অজানা আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছিল পরিবারটির সদস্যরা।
সোহাগের বোন খালেদা আক্তার জানান, মঙ্গলবার সকাল ৬টার দিকে নাজিরাবাজারের রাস্তার পাশে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন তার চাচা মোহাম্মদ সেলিম ও তাজুল ইসলাম। তাঁরাই সোহাগকে বাড়ি নিয়ে আসেন। তাঁরা দুজন ওই সময় হাঁটতে বের হয়েছিলেন বলে জানান।
খালেদা জানান, সোহাগ কোথায় ছিল, কারা দিয়ে গেছে, সে কিছুই বলতে পারছে না। তাকে এসব কথা জিজ্ঞাসা করতেও বারণ করছে সে। সে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
খালেদা আক্তার তাঁর ভাই সোহাগকে ফিরে পাওয়ায় সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান। মিজানুর রহমান সোহাগের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হলে সে জানায়, গত ২৭ মার্চ রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে সে ঘরে অনেক মানুষজন দেখতে পায়।
অন্যদের সঙ্গে নিজের বাবা ও বোনকেও দেখে সে। তখন শুধু লুঙ্গি পরা ছিল তার। এত মানুষ দেখে উঠে বসে সোহাগ। ঘরে আসা অপরিচিত এক ব্যক্তি তাকে বলে, ‘চল, গেঞ্জি পর।’ লুঙ্গিটা ঠিক করে গেঞ্জি পরে সোহাগ তাদের সঙ্গে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
‘গেঞ্জি পরার পর আমাকে বাইরে নিয়ে এসে চোখ, হাত-পা বেঁধে ফেলে তারা। এমনভাবে বেঁধেছিল, আমি মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, কবে আমার জ্ঞান ফিরেছিল তা বলতে পারব না। তত দিন চোখ আর হাত-পা বাঁধাই ছিল। এখনো দাগ আছে’—এ পর্যন্ত বলে চোখের কাছে কপালের পাশটায় দেখায় সোহাগ।
মাথাব্যথায় কাতর সোহাগ জানায়, ‘আমি এখানে আসার পর দেখি এক চাচা আমার এক কাঁধ আরেক চাচা আরেক কাঁধ জড়িয়ে ধরে আছেন। আমাকে আনার পর গোসল করানো হয়। এটুকুই মনে আছে।’
এখানে কিভাবে এলে প্রশ্নের উত্তরে সোহাগ জানান—‘আমি বলতে পারব না, আমি জানি না। এখনো আমার মাথা ঘুরছে। আমি কোথায় ছিলাম জানি না। আমার চাচা আমাকে কিভাবে কোথায় পেয়েছেন তাও জানি না। আমি শুধু দেখলাম আমার চাচা আমাকে ধরে আছেন।’
সোহাগ বলে, ‘ধরে নেওয়ার অনেক দিন পর হুঁশ হয়। অলটাইম পিছমোড়া করে হাত এবং চোখ বাঁধা থাকত। আমাকে নিয়ে যাওয়ার সময়ও তাদের ঠিকমতো দেখি নাই। সবাই সাদা পোশাকে ছিল। ঘর থেকে বের করার পরই গামছা জাতীয় কিছু দিয়ে টাইট করে আমার চোখ-হাত বেঁধে ফেলে।’
সোহাগ আরো বলে, ‘সেখানে তারা আমাকে খাবার দিত। চোখের বাঁধনটা হালকা একটু তুলে খাইয়ে আবার শক্ত করে চোখ বেঁধে ফেলে রেখে যেত। তারা আমাকে তিন বেলাই খাবার দিত। ভাত দিত, রুটি দিত। ফ্লোরের বিছানাতেই শুইতাম। ফ্লোর টাইলস করা ছিল। এক ঘরেই ছিলাম এত দিন।’
সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না এ প্রশ্নের জবাবে সে বলে, ‘আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করা হয় নাই।’ তনুর প্রসঙ্গে সোহাগ বলে, ‘তনুকে আমি চিনি না। এ বিষয়ে আমাকে কোনো প্রশ্ন করে নাই। কী কারণে আমাকে নিয়ে গেল সেটাও বলে নাই। আল্লাহই আমাকে ফিরিয়ে আনছে। সকলের দোয়ায় ফিরে আসছি। আমি কোনো অপরাধ করি নাই। এখন আমার প্রশ্ন, আমাকে কেন এবং কারা এইভাবে ঘর থেকে ধরে নিয়ে গেল?’
সোহাগ আরো বলে, ‘সেখানে তারা আমাকে সারাক্ষণ বেঁধে রাখত। এ অবস্থায় ঘুমও আসত না। আমার সঙ্গে সব সময়ই একজন থাকত। বাথরুমে গেলেও একজন সঙ্গে থাকত। এখন পর্যন্ত আমার পেট শক্ত হয়ে আছে। কিছু খেতেও পারছি না। যে আমার সঙ্গে থাকত সে সব সময় আমার পেছনে থাকত। যে কারণে আমি তাকে দেখতে পাই নাই।’
কলেজ ছাত্রী তনুর বিক্ষোভ মিছিলে যাওয়া প্রসঙ্গে সোহাগ বলে, ‘নাজিরাবাজারে বিকেলবেলায় একটি মিছিলে গেছিলাম। মানববন্ধন করেছিলাম। আমারও মা-বোন আছে। এভাবে কি একটা মেয়েকে মেরে ফেলবে। তাই বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিলে গেছিলাম। পাপ তো করি নাই। এই জন্য মনে হয় ফিরায়া দিছে আল্লাহ।’
সোহাগের চাচা সেলিম বলেন, ‘আমি বাড়িতেই কৃষিকাজ করি। সকালে উঠে নামাজ পড়ার পর রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে দেখি সোহাগ রাস্তার সাইডে হাইওয়েতে হাঁটছে। আমি আর আমার সঙ্গে থাকা তাজুল দৌড়ায়া গিয়া সোহাগকে জড়িয়ে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসি। তার হাত-পা বাঁধা ছিল না। শুধু লুঙ্গি আর গেঞ্জি ছিল গায়ে। সঙ্গে আর কিছু ছিল না। আশপাশে আর কাউকে দেখি নাই। শুধু তাকেই দেখলাম। সে একা ঘুরছিল। তখন সকাল ৬টা বাজে।’
সোহাগের মা সাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি দোয়া করি সকলের জন্য। সবাই আমাদের সাহায্য করছে। আমার ছেলেকে আমি ফিরে পাইছি। আমি আর কিছুই চাই না। আমার ছেলে তো এখন পর্যন্ত বলতেই পারছে না তাকে কে নিয়ে গেছে, কিভাবে নিয়ে গেছে, কোথায় নিয়ে গেছে। সে অসুস্থ।’
তিনি আরো জানান, বিকেলে সোহাগকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ডা. রাসেলের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ডাক্তার বলেছেন, তেমন জটিলতা নেই। সোহাগ ক্লান্ত। তার বিশ্রাম দরকার। ঘুম আর বিশ্রাম হলে, ঠিকমতো খেলে দ্রুত সেরে উঠবে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী নিহত সোহাগী জাহান তনুর ভাইয়ের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগ উদ্ধার হওয়া প্রসঙ্গে বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ উত্তম কুমার বড়ুয়া জানান, তাঁদের তৎপরতার কারণেই সোহাগ ফিরে এসেছে।
এর আগে সোহাগের বাবা নুরুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, তনু হত্যার খবর টিভিতে দেখে তনুর ভাই আনোয়ার হোসেনকে ফোন দিয়েছিল সোহাগ। এরপর এলাকায় তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন সংগঠিত করে সোহাগ। এসব কারণেই তাঁর ছেলেকে তুলে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করেন নুরুল ইসলাম।
উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার একটি জঙ্গল থেকে কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মৃতদেহ পাওয়া যায়। তাঁকে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পরদিন তনুর বাবা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
৩১ মার্চ সন্ধ্যায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) থেকে মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তারাই তদন্ত করছে। সূত্র- কালের কণ্ঠ।
এমবি





