সড়ক ও ফুটপাত হকার মুক্ত করতে রাজধানীতে হলিডে বা ছুটির দিন মার্কেট চালু করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কের ফুটপাত থেকে হকার সরিয়ে নিতে এ উদ্যোগ নেয় সিটি কর্পোরেশন। এর পর বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ার পরেও কোনো কাজ হচ্ছে না। এরপর চলে টানা উচ্ছেদ।
দীর্ঘদিন ধরেই জনসাধারণের চলাচলের পথ ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করে আসছেন হকাররা। তাদের কারণে স্বাভাবিকভাবে ফুটপাতে চলাফেরা করা যেতো না। এ অবস্থায় বিভিন্ন সময় হকারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযানও চালিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু অভিযান শেষ হতে না হতেই ফের বেদখলে চলে যাচ্ছে ফুটপাত।
এমন পরিস্থিতিতে প্রাথমিক অবস্থায় ৫টি হলিডে (ছুটির দিন) মার্কেট চালু করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে মার্কেটগুলোতে হকার বসার জন্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়।
সপ্তাহের সরকারি বন্ধের দিন শুক্রবার হলিডে মার্কেটে বসতে পারবে হকাররা। এতে সপ্তাহের এদিন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ীভাবে নগরবাসীরা কেনাকাটা করতে পারবেন। কাপড়, প্রসাধনী, জুতা, গৃহস্থালি ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সুলভমূল্যে পাওয়া যাবে। এতে বেশি উপকৃত হবে নগরীর নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
এসব মার্কেট চালু করতে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনকে চিঠি দেয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। চিঠিতে সম্ভাব্য স্থানগুলোর তালিকা পাঠাতে বলা হয়েছে। এর আগে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়েও এমন মার্কেট চালু করা হয়েছিলো। ঠিক সে আদলেই মার্কেটগুলো তৈরি করা হয়েছে।
মূলত হকারদের ব্যবসাকে সুনির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আনতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই এসব মার্কেট পুনরায় চালু করে সরকার। এরপর বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ডিএসসিসি এলাকার প্রায় ১৯টির মতো স্থানের তালিকা জমা দেয়া হয়।
এরপর এগুলো যাচাই-বাছাই শেষে প্রাথমিক একটি তালিকা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পাঁচটি স্থানের অনুমোদন দেন। এরপর ৩০ ডিসেম্বর থেকে হলিডে মার্কেট চালু করে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।
মার্কেটগুলো হচ্ছে- মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের সামনে ফুটপাতের উভয় অংশ। আয়তন, আইডিয়াল স্কুল থেকে এজিবি কলোনি মার্কেট পর্যন্ত ফুটপাতের অংশ, যার দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট এবং প্রস্থ চার ফুট।
বায়তুল মোকারম লিংক রোড। এর জায়গা হচ্ছে মার্কেটের উত্তর অংশ থেকে দক্ষিণের জিপিও গেইট পর্যন্ত বিস্তৃত। এর দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট এবং প্রস্থ চার ফুট।
দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকা। এর এলাকা বিস্তৃত হচ্ছে- সাধারণ বীমা কার পার্কিং থেকে ইউনুছ সেন্টার পযর্ন্ত। এর দৈর্ঘ্য এক হাজার ফুট এবং প্রস্থ চারফুট।
নবাবপুর রোড। এর বিস্তৃতি- কাপ্তান বাজার মোড় থেকে রায় সাহেব বাজার মোড়। এর দৈর্ঘ্য তিন হাজার ফুট এবং প্রস্থ চার ফুট।
সেগুন বাগিচা এলাকা। এর জায়গা হচ্ছে- কার্পেট গলি থেকে রাজস্ব ভবন রোড পযর্ন্ত রাস্তার পশ্চিম অংশ। এর দৈর্ঘ্য ৮০০ ফুট এবং প্রস্থ চার ফুট।
এসব মার্কেট সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। নির্ধারিত সময়ের পর দোকানিদের নিজ দায়িত্বে তাদের মালামাল সারিয়ে নিতে হবে। এমন তথ্য দিয়ে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করতে যাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। এ বছরের শুরুতেই মার্কেটগুলো পুরোদমে চালু করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
হলিডে মার্কেট চালুর পরেও হকারদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় ৩ ও ১১ জানুয়ারি হলিডে মার্কেট নিয়ে হকার নেতা ও কর্পোরেশনের কাউন্সিলর ও কর্মকর্তাদের নিয়ে পৃথক দুটি বৈঠক করেন মেয়র সাঈদ খোকন।
১১ জানুয়ারির বৈঠকে মেয়র গুলিস্তান, মতিঝিল, পল্টন ও জিপিওসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারি কর্মদিবসে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত কোনো হকার বসতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা দেন। যারা হলিডে মার্কেটে যাবে না তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ারও ঘোষণা ছিলো।
কিন্তু এরপরেও কেউ হলিডে মার্কেটে যাচ্ছে না। এর পর ১৫ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ফুটপাতে টানা চারদিন উচ্ছেদ শুরু করে সংস্থাটি। এসময় ফুটপাতে রাখা হকারদের চৌকি, বক্স ও মালামাল অপসারণ করা হয়। এরপর ফুটপাত পাহারায় নিয়োগ দেয়া হয় স্বেচ্ছাসেবকও। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি এই হকারদের খোদ সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলরই ইন্ধন দিচ্ছেন। সে জন্যই মূলত হকাররা হলিডে মার্কেটে যাচ্ছে না।
এর আগেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে হকার পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে হলিডে মার্কেট চালু করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু সে সরকারের শেষের দিকে হলিডে মার্কেটের নিয়মকানুন অনেকটা ভেঙে পড়ে। এর পর থেকে আস্তে আস্তে হকাররা পুরো নগরীর ফুটপাত দখল করে ব্যবসা শুরু করতে থাকে।
ডিএসসিসির জরিপ মতে- শুধু রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় দুই হাজার ৫০৬ জন হকার রয়েছে। আর হকার সংগঠনগুলোর দাবি দুই সিটিতে প্রায় ছয় লাখ হকার রয়েছে। এর মধ্যে শুধু দক্ষিণ সিটিতেই আছে তিন লাখ। এসব হকার উচ্ছেদে প্রতিনিয়ত বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে সংস্থাটিকে। বিভিন্ন সময় এসব হকারদের পুনর্বাসনের কথাও বলে আসছে সিটি কর্পোরেশন।
এসব বিষয়ে দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ফুটপাত জনগণের সম্পদ। আমি জনগণের সম্পদ জনগণকে বুঝিয়ে দিয়েছি। তা উদ্ধারে উচ্চ আদালতের নির্দেশ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হকারদের জন্য হলিডে মার্কেট চালু করেছি। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। কে কি করবে তা দেখার বিষয় নয়।’
এমএনজে





