রাজধানীর অনেক ফুটপাতেই এখন লাল-হলুদ টাইলস চোখে পড়ছে। কোথাও কোথাও এখনো বসানোর কাজ চলছে। 

এ টাইলসে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা নির্দেশক রয়েছে। তাঁদের চলাচলের সুবিধার জন্যই বিশেষ এ টাইলস। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা এতে খুশি। তবে তাঁরা বলছেন, ফুটপাতে প্রতিবন্ধকতা ও নির্দেশক নিয়ে কিছুটা সমস্যা রয়েছে।

দুপাশে লাল ও মাঝখানে হলুদ রঙের টাইলস। মাঝের হলুদ টাইলস লম্বাটে উঁচু উঁচু দাগের মতো। হাঁটতে গেলে বোঝা যাবে লালগুলোর চেয়ে এগুলো আলাদা। আবার যেখানে ফুটপাত শেষ, সেখানে হলুদ টাইলসগুলোয় ছোট ছোট গোলাকৃতি নকশা আছে।

কিন্তু এই টাইলস ধরে আমরা হাঁটতে পারি না। কারণ কিছুদূর যাবার পরেই কোনও না কোনও বাধার মুখে পড়ি। যা আমাদের মতো মানুষের কাছে ফুটপাত ব্যবহারকে অনিরাপদ করে তুলেছে।’

এভাবেই ফুটপাতে চলাচলে নিজের অসুবিধার কথা জানিয়েছেন উইমেন উইথ ডিজ্যাবিলিটি ফর বাংলাদেশ (ডাব্লিউডিডিএফ)’র চেয়ারম্যান শিরিন আখতার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা শিরিন দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করছেন।

তিনি বলেন, ‘সড়কে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের চলাচল সহজ করতে বিশেষ ধরনের হলুদ টাইলস ব্যবহার করা হয়। ফুটপাতে চলাচল করার সময় এই বিশেষ টাইলস অনেকেরই নজরে আসে।’

তবে যাদের জন্য এই টাইলসের ব্যবহার তারাই এর সুফল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

শিরিন বলেন, ‘দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য টাইলসগুলো সঠিক স্থানে দেওয়া হচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে ফুটপাতে টাইলস দেওয়া হলেও গাছ সরানো হচ্ছে না। এর ফলে টাইলস ধরে এগোতে গেলে গাছের সঙ্গে ধাক্কা খেতে হয়।

আবার অনেক সময় লাইটপোস্ট সরানো হচ্ছে না, টেলিফোনের বক্স সরছে না। ফুটপাত থেকে হকার উঠছে না। এতে করে আমাদের কোনও লাভ হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘সড়কের পাশের ফুটপাত ধরে নিরাপদে চলাচলের কথা বলা হলেও তা এখনও অনিরাপদ। আবার অনেক স্থানে সড়কের পাশে ফুটপাতই থাকে না। আবার রাস্তায় কিছুক্ষণ ফুটপাত থাকার পর কোনও বাড়ি বা ভবনের গেটের সামনে সেটা নিচু হয়ে যায়। এতে করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ অন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলে সমস্যা হয়।’

সড়কের পাশে হাঁটার জন্য ফুটপাত ঠিকমতো থাকছে না উল্লেখ করে সেন্টার ফর সার্ভিসেস অ্যান্ড ইনফরমেশন অন ডিজ্যাবিলিটির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম বলেন, ‘ফুটপাত তো ফুটপাত থাকছে না।

ঢাকার শহরের বেশিরভাগ যায়গায় কোনও ফুটপাত নেই। এখন তো ফুটপাতেই নানা মার্কেট বসে। তাই ফুটপাতে বিশেষ টাইলসের ব্যবহার করে লোক দেখানোর কোনও মানে নেই। এই কথাটা আমরা বারবার বলে আসছি। ফুটপাতে বিশেষ টাইলসের ব্যবহার দরকার, তবে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে কোনও অর্থ থাকে না, কোনও লাভ নেই।’

ভুক্তভোগী শিরিন আখতার আরও বলেন, ‘আমরা নিরপদ ফুটপাত ও বিশেষ টাইলসের ব্যবহার নিয়ে বহু আলোচনা-সভা, সেমিনারে বলেছি। এটা উনারা (কর্তৃপক্ষ) করছে, কিন্তু ঠিকমতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না। আমরা বলেছি টাইলসগুলো যে বসানো হচ্ছে সেগুলো যেন ঠিকভাবে ধরে এগোনো যায়।

টাইলসগুলো যেন সঠিকভাবে একটা নির্দেশনা দেয়। ফুটপাত থেকে টেলিফোনের লাইন, পোস্টার, এগুলো যেন সরিয়ে ফেলা হয়। যাতে টাইলসটা ধরে নিরাপদে যাওয়া যায়।’

ফুটপাতের মাথায় বেপরোয়া মোটরবাইক থামাতে খুঁটি বসিয়ে দেওয়ার বিষয়টির সমালোচনা করেছেন শিরিন। তিনি বলেন, ‘ফুটপাতের মাথায় তো খুঁটি বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা করার ফলে হুইল চেয়ারও যেতে পারছে না।

এই ফুটপাতে কতটা নিরাপদে উঠা সম্ভব? সাদাছড়ি দিয়ে কি এই ফুটপাতে উঠা সম্ভব? এত উঁচুতে তো সাদাছড়ি টাচ করার কোনও নিয়ম নেই।’

ফুটপাতের বেহাল অবস্থা নিয়ে জহুরুল আলম বলেন, ‘আমরা বলেছি, ওরা (প্রশাসন) করছে। কিন্তু ফুটপাত আছে, এ বিষয়টিইতো নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফুটপাতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা হাঁটবে শুধু তা নয়, এই ফুটপাততো প্রতিবন্ধীরাও ব্যবহার করবে। তারা কি কেউ এটা ব্যবহার করতে পারবে? প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন তার উদ্যোগ আছে, তার পক্ষে তো এগুলো দেখা সম্ভব নয়। এগুলো সংশ্লিষ্টদের নিশ্চিত করতে হবে, তাদের যে রাস্তাগুলো আছে সেগুলোতে হুইল চেয়ারপারসন ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা যাতে হাঁটতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘ফুটপাতের হলুদ টাইলস কতটুকু কাজে লাগবে তা দেখে আমি হাসি। এগুলো করে কি হবে? এক্সেসেবল সিটির কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এটা আসলে তেমন সিটি না। আপনি দেখবেন ফার্মগেটের পর কতগুলো রাস্তা কাটা।

ওই রাস্তা দিয়ে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা হুইল চেয়ারপারসন কীভাবে যাবে। ওখানে সবসময় চলমান গাড়ি থাকে। কীভাবে একজন রাস্তা পার হবে।’

সোসাইটি ফর দ্য ওয়েলফেয়ার অব দ্য ইনটেলেকচ্যুয়াল ডিজ্যাবিলিটির (সুইড বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য ভালো। এ উদ্যোগ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের নিরাপদ পথচলার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আমরা মনে করতে পারি। কিন্তু এটা কার্যকরি হচ্ছে না। কেউ তো এর উপকারভোগী হচ্ছে না। তবে তৈরি হচ্ছে।’

এক্ষত্রে ফুটপাত ব্যবহারে প্রতিবন্ধীদের সচেতন করা এবং ফুটপাতের দেখভালের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে বিশেষ টাইলস বসানোর ক্ষেত্রে আরও সচেতন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

এএস