দাবিকৃত চাঁদা না দেয়ায় এক নারীকে বিবস্ত্র করে বর্বর নির্যাতন করেছে যুবলীগের এক নেতা। ঘটনাটি ঘটেছে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হাতিয়া পৌরসভায়। চাঁদা না পেয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে শাহানারা (৩২) নামে ঐ নারীকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক পিটিয়েছে যুবলীগ নেতা ও থানার দালাল শাহজাহান।

গুরুতর আহতাবস্থায় তাকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনাটি ঘটে ।

জানা যায়, হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের রিয়াজ উদ্দিনের স্ত্রী শাহানারা বেগম। তার সঙ্গে স্বামীর মতবিরোধ দেখা দেয়। বিরোধ মিটিয়ে দেবে বলে তার কাছে চাঁদা দাবি করে যুবলীগ নেতা শাহজাহান। শাহানারা চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে একা পেয়ে প্রথমে তাকে কিল-ঘুষি-লাথি মেরে রাস্তায় অজ্ঞান করে ফেলে এবং পরে প্রকাশ্যে বহু মানুষের উপস্থিতিতে বিবস্ত্র করে লাঠি দিয়ে পুরো শরীর পিটিয়ে জখম করে।

এ সময় শাহানারার আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও নির্দয় শাহজাহান দম্ভোক্তি করে বলে, ‘আমার নাম শুনিসনি। আমি তোকে আজ মেরেই ফেলব। তোর বাবাদের কাছে আমার বিরুদ্ধে মামলা কর।’ এ বলে অজ্ঞান অবস্থায়ও প্রায় আধা ঘণ্টা পা থেকে মাথা পর্যন্ত মোটা গাছের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সমস্ত শরীর থেঁতলে দেয়।

 এতে শাহানারার শরীরের অনেক স্থান ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে পড়ে। শাহজাহানের ভয়ে বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলেনি। এ দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করেন এক যুবক। শুক্রবার ভিডিওটি ফাঁস হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাহানারা বেগম তার স্বামী রিয়াজ উদ্দিনের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে প্রথমে স্থানীয় এক উকিলের কাছে গিয়ে বিচ্ছেদের জন্য এফিডেভিট করতে চান; কিন্তু কাবিন না থাকায় উকিল তাকে পৌরমেয়রের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পৌরমেয়র মীমাংসাও করে দেন।

এই সুযোগে থানার দালাল শাহজাহানসহ আরো তিনজন তার বাসায় গিয়ে চাঁদা দাবি করে। এর আগেও বিভিন্ন সময় শাহজাহান এলাকায় চাঁদাবাজি করেছে বলে দাবি করেন শাহানারা বেগম। বাড়ি নির্মাণের সময়ও তিনি ১৪ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছেন শাহজাহানকে।

ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হতে থাকে। এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক ভিডিও করতে থাকেন। ভিডিওতে দেখা যায়, শাহজাহান গাছের মোটা ডাল দিয়ে শাহানারা বেগমকে পেটাচ্ছে।

 এ সময় স্থানীয় এক যুবক তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলেও কোনো কাজ হয়নি। একপর্যায়ে স্থানীয় এক প্রবীণ এগিয়ে আসেন কিন্তু তার কথাও শোনেনি শাহজাহান। এ ব্যাপারে শাহানারা বেগমের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, আমি সোমবার ব্যাংক থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা নিয়ে বাড়ি আসার পথে রাস্তায় শাহজাহান আমার কাছে চাঁদার টাকা চায়। আমি চাঁদা দিতে না চাইলে শাহজাহান আমার ব্যাগ কেড়ে নেয়। ব্যাগে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিল। এ ছাড়াও সে আমার গলায় থাকা দেড় ভরি স্বর্ণের চেইন টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে। একপর্যায়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পাশের গর্তে পড়ে যাই। গর্ত থেকে তুলে আমাকে পাশের একটি বাড়ির সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর রড দিয়ে মারে শাহজাহান। আমার মুখে পরপর কয়েকটা থাপ্পড় মারে এবং বুকে লাথি মারে। এ সময় আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি।

জ্ঞান ফিরে নিজেকে একটি অন্ধকার ঘরে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখি। তখন সামনে শাহজাহান ছাড়া আর কেউ ছিল না। এ সময় সে আমাকে শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা চালায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কামড় দেয়। স্পর্শকাতর স্থানগুলো থেকে রক্ত বের হতে থাকে। পরে স্থানীয় লোকজন জড়ো হতে থাকলে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় শাহজাহান।

এর আগে শাহানারা কান্নাজড়িতকণ্ঠে বলেন, ‘ভাইয়া শোনেন। এই শাহজাহান সন্ত্রাসী। চাঁদাবাজ। সে মানুষ থেকে চাঁদাবাজি করে খায়। থানার দালালি করে। আমার কাছ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে চাঁদা চেয়ে আসছে। আমি তাকে পাত্তা দিচ্ছি না। আমার টাকা পয়সা দেখে সে বিভিন্ন কৌশল খুঁজতে থাকে।’

 স্থানীয়রা জানান, থানার এই কথিত দালাল শাহজাহানের ভয়ে আতঙ্কিত এলাকাবাসীও। তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে সাহস পান না। থানা পুলিশের সঙ্গে সখ্য থাকায় ভয় দেখায় সে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪০ বছর বয়সী সেদিনের ঘটনার এক প্রত্যদর্শী বলেন, শাহানারাকে শাহজাহানের নির্যাতন দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এখনো রাতে ঘুমাতে পারেন না। তার ছোট নাতিটা ঘুমের ঘোরে আতঙ্কিত হয়ে জেগে ওঠে। এ দিকে এ ঘটনার পর শাহানারা একটি অভিযোগ দায়ের করলেও বিভিন্ন অজুহাতে থানা কর্তৃপক্ষ মামলাটি রেকর্ড করেনি। শুক্রবার রাতেই শাহানারাকে নির্যাতনের ঘটনায় ভিডিওসহ সংবাদ প্রকাশ করে কিছু অনলাইন মিডিয়া। এরপর টনক নড়ে থানা প্রশাসনের। রাতেই মামলাটি রেকর্ড করে আসামির খোঁজে নামে হাতিয়া থানা পুলিশ।

 এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ টি এম আরিচুল হক বলেন, ‘অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। শাহজাহানকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

এসটি