বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে পথচলার অঙ্গীকার করে ঢাকা ছাড়লেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে শনিবার সকালে দুইদিনের সফরে আসেন নরেন্দ্র মোদি। সফর শেষে রবিবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নরেন্দ্র মোদীকে বিদায় শুভেচ্ছা জানান শেখ হাসিনা।
ঢাকা সফরে নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, ব্যবসায়ী নেতা মাতলুব আহমেদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভারতের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি প্রশংসার দাবি রাখে। শুধু অর্থনীতিতেই নয় শিক্ষা, বাণিজ্য, সুশাসনসহ সব দিক থেকে ভারত এগিয়ে যাচ্ছে। ভারত শুধু আমাদের বন্ধু নয়, আমাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি এবং উন্নয়ন সহযোগী।’
সফরে রাষ্ট্রপতির দেওয়া মধ্যাহ্নভোজ এবং প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন নরেন্দ্র মোদি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখায় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িকে দেওয়া স্বাধীনতা সম্মাননা তার পক্ষে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে গ্রহণ করেন নরেন্দ্র মোদি।
বাজপেয়ির পক্ষে সম্মাননা নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আজকের দিনটি আমার জন্য সৌভাগ্যের আর ভারতবাসীর জন্য গৌরবের।
কেননা ভারতের মহাপুরুষ শ্রদ্ধেয় অটল বিহারি বাজপেয়ি তার সম্পূর্ণজীবন দেশের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবদান রেখেছেন।
যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, সেই মহান নেতার সুযোগ্য কন্যার উপস্থিতিতে এই সম্মাননা নিতে পারায় আমি গর্বিত।’
ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আগে রবিবার সন্ধ্যায় নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘এই সফরকে বিশ্ব সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করবে, মাপকাঠি দিয়ে দেখবে; এই সফরে বাংলাদেশ কী হারাল আর কী পেল।
আমি এই বিষয়ে একবাক্যে বলব, লোকেরা আগে মনে করত যে আমরা বাংলাদেশের খুব আশেপাশে রয়েছি। কিন্তু বিশ্বকে আজ স্বীকার করতে হবে, আমরা বাংলাদেশের আশেপাশেও আছি এবং সঙ্গেও আছি।
আমরা বাংলাদেশকে নিয়ে একসঙ্গে পথ চলব। কেননা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের শুধু রাজনৈতিক নয় আবেগপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে দুই দেশের মধ্যে আঞ্চলিক বাণিজ্য, ট্রানজিট, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে ১৯টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারত টেলিযোগাযোগ, নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, বিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক বিষয়েও চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
এছাড়া আরো ৫টি চুক্তিসহ ১২টি সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি প্রটোকলও স্বাক্ষর করা হয়।
ঢাকা সফরে নরেন্দ্র মোদি সাভারের জাতীয় স্মৃতি সৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
সম্মান প্রদর্শন করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে। উদ্বোধন করেন কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গৌহাটি বাস চলাচল সেবার।
নরেন্দ্র মোদি পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন পরিদর্শন করেন। বারিধারায় ভারতীয় নতুন চ্যান্সেরি ভবন উদ্বোধন করেন মোদি।
নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হাতে বানানো অন্ধ্র প্রদেশের বিখ্যাত শতরঞ্জি উপহার দিয়েছেন।
বহু কাঙ্খিত তিস্তা চুক্তি নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে হয়নি। তিস্তার পানিবণ্টন বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ভারতের রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় তিস্তা এবং ফেনি নদীর পানি সুষম বণ্টন নিশ্চিত হবে।
আমরা আমাদের নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখতে এবং নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে একসঙ্গে কাজ করবো। নদীগুলো আমাদের মাঝে আরো সুদৃঢ় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করবে, অনৈক্য নয়।
দুই দেশের সীমান্তের মানুষ এই পানির উপর জীবনধারণ করে থাকে। পানি একটি মানবিক ইস্যু, যা আমরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেব।’
নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো হলো- দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির নবায়ন, কোস্টাল শিপিং এগ্রিমেন্ট, মানোন্নয়ন বিষয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিএসটিআই-বিআইএস’র মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তি, ঢাকা-শিলং-গৌহাটি এবং কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস চলাচল চুক্তি।
অন্য চুক্তিগুলো হলো- ভারত-বাংলাদেশের কোস্টগার্ড বিষয়ে সমঝোতা, মানবপাচারবিরোধী সমঝোতা, চোরাচালান ও জাল নোট প্রতিরোধ সমঝোতা, বাংলাদেশকে ভারতের দেওয়া ২শ’ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের সমঝোতা, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে ব্লু-ইকোনোমি এবং সমুদ্র বিষয়ক সহযোগিতা চুক্তি, সার্কের আইইসিসি’র অধীনে সমঝোতা, বিজিবি-বিএসএফ সহযোগিতা স্মারক, ভারতীয় অর্থনৈতিক জোন, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা, বঙ্গোপসাগরে ভারতের কাউন্সিল অব সাইন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমঝোতা, আখাউড়ায় ইন্টারনেটের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউডথ ইজারা বিষয়ে বিএসএনএল ও বিএসসিসিএল এর মধ্যে সমঝোতা।
উভয় দেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ট্রানজিট ও বাণিজ্য (পিআইডব্লিউটিটি) প্রটোকল, বাংলাদেশের বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (ইডরা) এবং ভারতের লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির (এলআইসি) মধ্যে জীবনবীমা বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য একটি সম্মতিপত্র স্বাক্ষর করেছে।
এমকে





