আগামী জাতীয় নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও দেশের বাইরে অবস্থান করা নাগরিকদের ভোটের বিষয়টি বিবেচনা করাসহ বেশকিছু সুপারিশ কমিশনের কাছে তুলে ধরেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জনগণের আস্থা অর্জনের কথাও বলেছেন তাঁরা।

আজ সোমবার সকাল ১১টা থেকে নির্বাচন ভবনে ইসির সংলাপে নাগরিক প্রতিনিধিরা তাঁদের মতামত তুলে ধরেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার সভাপতিত্বে এ বৈঠক শুরু হয়। এতে অন্তত ৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। বৈঠক থেকে বের হয়ে পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অনেকে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন ঘিরে ভয়ের আবেশটা কয়েক জায়গায় কাজ করে। একটা হচ্ছে ভোটারের মনে, একটা হচ্ছে যাঁরা প্রার্থী তাঁদের, প্রার্থী-প্রস্তাবক তাঁদের মনে এবং যাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার। অনেক জায়গায় ভয়মুক্ত নির্বাচনের বিষয়টা মোটামুটি সবাই গুরুত্ব দিয়েছেন, এটা অর্জনের জন্য একটা বিষয় এসেছে যে সেনা মোতায়েনের বিষয়টা।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা বলেছি যে, হ্যাঁ লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে হবে এবং সব দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে। এ জন্য আইনের যদি কোনো ঘাটতি থেকেও থাকে সেগুলো আপনারা ব্যবস্থা করবেন এবং সরকারকে বলবেন।’

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য …পরিবর্তন করে আর্মড ফোর্সকে বা সশস্ত্র বাহিনীকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে সংজ্ঞা, সেই সংজ্ঞার ভেতরে আনতে হবে।’

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘যারা প্রবাসী বাংলাদেশি সিটিজেন, (তারা) যৌথ সিটিজেন না, তাঁদের ভোটের কথাটা উঠে এসেছে। এটা টেকনিক্যালি, ফাইন্যানশিয়ালি, অ্যাডমিনিস্ট্রিভলি কতটুকু ফিজিবল, কতটুকু করা যায়, সেটা নির্বাচন কমিশনার ব্যবস্থা করবেন।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত অলিউর রহমান বলেন, ‘আলোচনায় মূল ফোকাসটা দেওয়া হয়েছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে। আমরা যেন সবার অংশগ্রহণে ভোট দেখতে পাই। সহায়ক সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অনেকে বলেছে, তত্ত্বাধায়ক সরকার আনা হোক। আমরা বলছি, এটা আনা সম্ভব না, এটা ডেড ইস্যু। আর্মি নিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছে-আমরা বলেছি, তাদের ম্যাজিস্ট্রেশিয়াল পাওয়ার দেওয়া ঠিক হবে না। আর্মিকে ভোটে আনার দরকার নাই। পার্লামেন্টে ভেঙ্গে দেওয়ার কথা তুলেছে-আমরা বলেছি, ভেঙ্গে দেওয়া যাবে না।’

ইচ্ছেকৃতভাবে একটি গোষ্ঠী সমালোচিত বিষয়গুলোকে ঘুরিয়ে আনার চেষ্টা করেছে বলে জানান তিনি।

অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘ভোটের সময় সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারলেই জনগণ সন্তুষ্ট থাকবে। এ ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে হবে। ভোটে সেনা মোতায়েন করার কথা এলেও তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার কথা উঠেনি। ইসি সঠিকভাবে কাজ করলে কোনো রাজনৈতিক দলই তাদের পছন্দ করবে না। তবে জনগণকে তারা পাশে পাবে।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘ইসিকে জনগণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। তাদের দৃঢ় স্বাধীন ভূমিকা নিয়ে মানুষের কাছে দৃশ্যমান করতে হবে এবং তা প্রমাণ করতে হবে। নির্বাচনী আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। প্রশাসন কীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে এবং তাদের নিরপেক্ষ রাখতে ইসি কীভাবে ভূমিকা রাখবে-তা দেখতে হবে।’

দেবপ্রিয় আরো বলেন, “তফসিল ঘোষণার আগে ইসির করার কিছু নেই—এমন বক্তব্যকে আমরা অনেকে গ্রহণ করিনি। এখন থেকে ইসির অনেক কিছু করার সুযোগ রয়েছে। ধর্মকে নির্বাচনী প্রচারে কোনোভাবেই নেওয়া যাবে না। বড়ভাবে ঐকমত্য হয়েছে ‘না’ ভোট চালুর বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে। সেনাবাহিনীকে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে রাখতে হবে। পাশাপাশি এ দুটো বিষয়ে ভিন্নমতও এসেছে আলোচনায়।” তিনি বলেন, নির্বাচনী ব্যয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে আরো বেশি স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা রাখতে হবে। প্রয়োজনে আলাদা আইন করতে হবে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসির বন্ধু রাজনৈতিক দল নয়; ইসির বন্ধু হলো জনগণ, নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও আইন-আদালত। নির্বাচনকালীন-নির্বাচনোত্তর সহিংসতা রোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘ইসি কোনো ইস্যু রেইজ করেনি; তারা বলতে দিয়েছে। ইসিকে তার ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে হবে, বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। কমিশনকে সক্রিয় হতে হবে। সব দলকে নির্বাচনে নিয়ে আসতে হবে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে হবে। প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট ও ভোটারের মনে যে ভয়ভীতি রয়েছে, তা দূর করতে হবে, এটা নিয়ে কারো দ্বিমত ছিল না।’

নিজে পক্ষে থাকলেও সাবেক আমলাদের অনেকে সেনাবাহিনীকে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সংজ্ঞায় না রাখার জন্যও বলেছেন বলে জানান তিনি।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘সহায়ক সরকার নিয়ে আলোচনা উঠলেও অনেকে পক্ষ-বিপক্ষ নিয়েছেন। সেনাবাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো, ভয়ভীতি-শঙ্কা দূর করতে ইসি আসলে কোনো পদক্ষেপ নেয় কি না সবার দেখার বিষয় হয়ে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলেছেন এ নিয়ে ইসির কথা বলা উচিত নয়। আমাদেরও কথা বলা উচিত নয় বলে কেউ কেউ বলেছেন। ইসি চেষ্টা করেছে সবার বক্তব্য শোনার। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এখন ইসি কী পদক্ষেপ নেয় তা দেখা; এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

এই অধ্যাপক আরো বলেন, ‘আগের ইসি তাদের কাজকর্মে ইমেজ সংকটে পড়ে। কিন্তু আমরা চাই বর্তমান ইসি ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে উঠে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে সে ব্যবস্থা নেবে। তারা যেন রাজনৈতিক দলের কাছে মাথা নত না করে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সঠিক দায়িত্ব পালন করে এটা সবার চাওয়া।’

আসিফ নজরুল জানান, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা যায় কি না বিবেচনা করার জন্যে বলা হয়েছে। যেহেতু ডিসিরা রিটার্নিং অফিসার থাকে, সেক্ষেত্রে বিভিন্ন সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া যেতে পারে। আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত সময় ছিল না। এ জন্য অনেকে বক্তব্য লিখিত জমা দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে মতামত লিখিত দেওয়ারও সুযোগ রেখেছে কমিশন।

সংলাপে কমিশন প্রণীত নির্বাচনি কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ উপস্থাপন করে এ বিষয়ে সুশীল সমাজের অভিমত নেয় কমিশন। সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। ভোটারদের ভোট প্রদান নিশ্চিত করারও তাগিদ তাঁদের।

এমএনজে