সর্বগ্রাসী যমুনা গিলে খাচ্ছে সিরাজগঞ্জের চৌহালী। এরই মধ্যে উপজেলার বেশির ভাগ এলাকাই চলে গেছে নদী গর্ভে। প্রতি বছর যমুনার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে  একদিন চৌহালীর কোন চিহৃই আর থাকবে না। তাহলে কি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে চৌহালী!  

গতবার বন্যায় বড় বিপযর্য়ের পরও নদীর ভাঙন ঠেকাতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট জেলার পানি উন্নয়ন বোর্ড। তাই ভাঙন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।

চৌহালীতে একসময় ছিলো পাকড়াশী জমিদারদের বসবাস। তখন এলাকাটি ছিল ধনসম্পদে ভরপুর। কিন্তু এখন তার লেশমাত্র নেই। যমুনা গত ৬০ বছর ধরে দানবীয়রূপে এসব এলাকা গ্রাস করছে। ফলে ভিটেমাটি হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ সহায় সম্বলহীন হয়ে পড়েছে। তেমনি বাড়ছে হাহাকার। বাড়িঘর হারিয়ে অনেকেই চলে গেছেন আশপাশের এলাকায় কিংবা অন্য থানায়। কেউবা বসতি গড়েছেন অন্য জেলায় গিয়ে। কিন্তু যমুনার তাণ্ডব থেমে নেই। গত কয়েক মাসের বন্যায় যেন শ্মশানঘাটে পরিণত হয়েছে চৌহালী।

স্থানীয়দের দাবি, উপজেলা পরিষদসহ সরকারি অন্যান্য স্থাপনা রক্ষায় ১ হাজার ৭১৫ মিটার দৈর্ঘ্যের বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকারিভাবে ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। অনিয়ম, লুটপাট ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে তার সঠিক ব্যবহার হয়নি। তাই রক্ষা পায়নি উপজেলা হেড কোয়ার্টারসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

যমুনা নদী চৌহালী উপজেলাকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। নদীর পূর্ব পারে পাঁচটি এবং পশ্চিম পারে দুটি ইউনিয়ন। গত বন্যার ভয়াবহ ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পূর্ব পারের পাঁচ ইউনিয়ন।

চৌহালীর বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার জুড়ে এখন কেবলই ভাঙনের তাণ্ডবলীলা। এর মধ্যে স্থলচর, ধলাই, উপজেলা সদরের খাসকাউলিয়া, জোতপাড়া, রেহাইপুকুরিয়া, খাস পুকুরিয়া, সম্ভুদিয়া, পয়লা, চর সলিমাবাদ অন্যতম। একের পর এক বিলীন হয়েছে এসব এলাকার আবাদি জমি, ঘরবাড়ি।

চৌহালীর খাসকাউলিয়া ইউনিয়নে গড়ে তোলা হয় উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স। ‘উপজেলা সদর’ নামে পরিচিত উপজেলা কমপ্লেক্সের পুরোটাই এ বছর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। কর্মব্যস্ত মানুষের কোলাহলে দিনভর মুখর থাকা উপজেলা পরিষদ চত্বরের নিশানাও আজ আর নেই। গত আগস্ট মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় এবং সর্বশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর কার্যত প্রশাসনিক ‘পতন’ ঘটে চৌহালী উপজেলার।

ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে নদীর পূর্ব এলাকা উপজেলার বোয়ালকান্দি থেকে দক্ষিণে পাথরাইল পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং পশ্চিমে এনায়েতপুরের চাঁদপুর থেকে দক্ষিণে পাঁচিল পর্যন্ত প্রায় আট কিলোমিটার এলাকার সিংহভাগ অংশ। এই ভাঙনের ফলে অর্ধশত সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রায় কয়েক হাজার একর জমিজমা, ২ হাজার ঘরবাড়ি ও ২২টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হয়েছে।

সরেজমিনে চৌহালী উপজেলায় গিয়ে দেখা যায়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের কাজ চলছে ‘সদর’ থেকে ৭০০ গজ দূরে মহিলা ফাজিল মাদ্রাসায়। গত আগস্ট মাসের শেষের দিকে সেখানে অস্থায়ীভাবে কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে এ বছরই আরও একবার ইউএনওর কার্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ভাঙনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় গত জুলাই মাসে ইউএনওর দপ্তর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানান। এখন মাদ্রাসা ভবনও নদীভাঙনের আতঙ্কে রয়েছে। পাড় ভাঙতে ভাঙতে মাদ্রাসার ৫০০ গজের মধ্যে যমুনা চলে এসেছে।

ওই কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুরো উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো ভেঙে গেছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে যেখানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, অব্যাহত ভাঙনের কারণে সেসব এলাকাও নিরাপদ নয়।

ইউএনওর কার্যালয় সূত্র জানায়, দেড় লাখ জনসংখ্যার চৌহালী উপজেলার আয়তন প্রায় ২৪৩ বর্গ কিলোমিটার। গত কয়েক মাসের ভাঙনেই উপজেলার প্রায় ২০ শতাংশ যমুনায় হারিয়ে গেছে।

মহিলা ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে জোরপাড়া বাজারে চৌহালী ডিগ্রি কলেজ। এই কলেজের কয়েকটি কক্ষে থানাসহ উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের কার্যালয় স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানে পাশাপাশি দুটি কক্ষে ঠাঁই মিলেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ ও থানার অফিসার ইনচার্জের। জায়গা না হওয়ায় বারান্দায় বসে কাজ করতে হচ্ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। আর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সরিয়ে নেওয়া হয়েছে জোরপাড়া বাজার থেকে এক কিলোমিটার দূরে চৌহালী আলিয়া মাদ্রাসায়। সেখানে কোনোরকমে চলছে চিকিৎসাসেবার কাজ।

এদিকে কলেজে সরকারি দপ্তরের কার্যালয় চালু করায় লেখাপড়ায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে চৌহালী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন  বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি চিন্তা করেই সরকারের বিভিন্ন কার্যালয় কলেজে স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কলেজ প্রাঙ্গণের জন্য দুটি টিনের ঘর উপজেলা পরিষদ থেকে নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে আপাতত পাঠদান চলছে।

এদিকে ভাঙনে সবচেয়ে দুর্ভোগে পড়েছে খেটে খাওয়া নদীপারের সাধারণ মানুষ। রাক্ষুসে যমুনার পেটে শেষ সম্বল বসতভিটা হারিয়ে অনেকে বাস করছেন অর্ধখোলা ঘরে আকাশের নিচে। কেউবা বাপ-দাদার ভিটা হারিয়ে মনের দুঃখে পাড়ি জমিয়েছেন অন্য জেলায়।

আফসার আলী নামে ৮০ বছর বয়সি এক বৃদ্ধ  জানান, ‘জীবনে অনেক ভাঙন দেখছি। কিন্তু এবারের মতো ভাঙন আর দেখি নাই।’ জাবেদা বেগম নামে একজন বলেন, ‘রাইতের আন্দারে সব ভাইসা গেছে। স্বামী-সন্তান নিয়া কোনোরকমে ঘর থেইকা জান নিয়া বাইর হইছি। এহন আমাগোর আর কিছুই হারাইবার নাই।’

জসিম উদ্দিন নামে একজন বলেন, ‘রাতের ঘুমাবার উপায়ও আমাদের নেই। প্রায়ই নৌকা দিয়ে ডাকাত এসে আমাদের সব ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আমরা প্রায় সময়ই রাত জেগে সবাই মিলে পাহারা দিই।’

তবে এই এলাকার মানুষের এত দুর্ভোগের পরও স্থানীয় সংসদ সদস্য তাদের কোনো খোঁজ নেন না বলে জানালেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে বলেন, ভাঙনের পর জেলার মন্ত্রী এলাকায় এলেও স্থানীয় এমপি ভুল করেও এই এলাকায় আসেননি।

নদীর দানবীয় রূপের কারণে আতঙ্ক বিরাজ করছে এলাকার প্রতিটি মানুষের মাঝে।

ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ঘোরজান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান মন্টু, সমাজসেবক শাহজাহান সরদার, মিটুয়ানী উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম, শিক্ষক মাওলানা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘যমুনার ভাঙন দেখতে-দেখতে আর ঘরবাড়ি সরাতে সরাতে আমরা বিরক্ত হয়ে পড়েছি। তার পরও যদি উপজেলা পরিষদটুকু থাকত, তাও গর্ব করে বলতে পারতাম, আমরা উপজেলা পরিষদের কাছাকাছি এলাকার মানুষ। গত বছর তারও ৮০ ভাগ এলাকা হারিয়েছি। আর অবশিষ্ট ২০ ভাগও মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।’

এর পরও এলাকা রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা না থাকায়  কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন খাসকাউলিয়া গ্রামের প্রবীণ শিক্ষক (অব.) আনছার আলী মাস্টার, আব্দুর রশিদ, গৃহিণী ডলি খাতুন, রেহাই কাউলিয়া গ্রামের নাজমা খাতুন। তারা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় এমপিরা ভোট চাইতে সবাই আসেন, দেন নানারকম প্রতিশ্রুতি- রোধ করবেন ভাঙন। কিন্তু বিজয়ী হওয়ার পর আমাদের কেউ খেয়াল রাখেন না। তারা থাকেন চকচকে পাঞ্জাবি পরে এসি বাড়ি গাড়িতে। এসব এলাকা দেখার সময় নেই।’

তারা আরো বলেন, ‘খবর পেয়েছি আবারও কাজ হবে। এ কাজে এলাকার কোনো লোক সম্পৃক্ত থাকলে, আবার ঠিকাদারদের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা ব্যবসা করলে এ কাজ করে লাভ নেই।’ অতীতে এমন হওয়ায় ৩০ ভাগ কাজও বাস্তবায়ন করা হয়নি। সব নদীতেই গেছে। তাই ভবিষ্যতে কাজের তদারকিতে সেনা মোতায়েনের পাশাপাশি দুর্নীতি মুক্ত কাজ বাস্তায়নের দাবি জানালেন এসব মানুষ।

চৌহালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল্লাহ আল মামুন  বলেন, ‘উপজেলার রাস্তাঘাট, অবকাঠামো সবকিছু ভেঙে গেছে। অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই বছরই উপজেলা পরিষদের আটটি ভবন, ২২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় ২ হাজার বাড়িঘর, হাজার হাজার হেক্টর আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। কার্যত এখন আমি পানির রাজ্যের চেয়ারম্যান হিসেবে খ্যাতি পেয়েছি। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড ভাঙন ঠেকাতে কোথাও কোনো কাজ করেছে বলে আমার জানা নাই।’ তা ছাড়া উপজেলা নির্বাহীসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা থাকায় উপজেলার উন্নয়নও তেমন হচ্ছে না বলে জানালেন আবদুল্লাহ আল মামুন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য কোনো সাহায্য করছেন কি না এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, ‘এমপি সাহেব কী করেছেন তা উনিই বলতে পারবেন। এলাকায় না এলেও হয়তো উচ্চ পর্যায়ে ভাঙন রোধে তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন!’

চৌহালী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শামসুল ইসলাম বলেন, এভাবে কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সমস্যা হচ্ছে। রাতে কোনো আসামি ধরলেও তাকে রাখার কোনো জায়গা নেই। তিনি বলেন, ‘নিজেদের থাকার জায়গা নেই। যেখানে অফিস, সেখানেই থাকতে হচ্ছে। রাস্তা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগের জন্য নৌকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’

সাম্প্রতিক ভাঙন ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (চৌহালী উপজেলা এর আওতাধীন) নির্বাহী প্রকৌশলী জ্যোতি প্রকাশ ঘোষ বলেন, ‘যমুনা নদীর গতিপ্রকৃতি বোঝা খুব কঠিন। ভাঙন ঠেকাতে চেষ্টা করা হলেও তা রোধ করা যায়নি।’

তিনি বলেন, উপজেলা রক্ষার জন্য এডিবির অর্থায়নে ১২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ এলে কাজ শুরু হবে। এ সময় চৌহালী উপজেলাকে মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে দেবেন না বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

এলাকার মানুষের বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌগাছা) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মজিদ মণ্ডলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে চৌহালী উপজেলা- এমনই ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

জেআই