রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর আওতায় গঙ্গাচড়া জোনাল অফিস দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে।
নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে মিটার প্রতি ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হচ্ছে। এর উপর চলছে সময়ক্ষেপণের হয়রানি।
উৎকোচ বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন অফিসের ডিজিএম হারুন অর রশিদ। তার প্রশ্রয়ে উৎকোচ বাণিজ্য পরিচালনা করছেন অফিসের বিলিং সুপারভাইজার, ইঞ্জিনিয়ার, ইন্সপেক্টর, লাইনম্যানসহ সংশ্লিষ্ঠ কতিপয় ইলেক্ট্রিশিয়ান ও দালাল। এদের দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে সাধারণ গ্রাহকরা।
অফিসের কতিপয় ইলেক্ট্রিশিয়ান সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের একটি নতুন মিটার সংযোগ নিতে সর্বনিম্ন ৮০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার পর্যন্ত টাকা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে সদস্য ফি, মিটার জামানত, ড্রাপ তারের মুল্য ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্রান্সফর্মার আপগ্রেড ফি। কিন্তু কেবল নির্ধারিত ফি জমা দিলে ১০ বছরেও কোনো গ্রাহক নতুক সংযোগ পাবেন না।
সূত্র আরো জানায়, সদস্য হওয়ার জন্য ১০০ টাকা ফি দিয়ে আবেদন করার পর ইন্সপেকশন করার নিয়ম আছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ঠদের সাথে যোগাযোগ করা না হলে ইন্সপেকশন হয় না। তাই এখানে গ্রাহকদের এক হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ দিতে হয়। এর পর বাড়িতে ইলেকট্রিশিয়ানদের দিয়ে ওয়ারিং করা ও অফিসে রিপোর্ট প্রদান করতে ইলেক্ট্রশিয়ানদের রয়েছে বিভিন্ন রেটের পারিশ্রমিক। এর পর ড্রপ তারের মূল্য ও মিটারের জামানত জামা দিতে হয় অফিসে। এজন্যও হয়রানি অনেক।
এর পর সিএমও অর্থাৎ মিটার লাগানোর জন্য অফিসিয়াল অর্ডার। এটি পেতেও গ্রাহকদের ধর্ণা দিতে হয় সংশ্লিষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে। সিএমও হওয়ার পরও রয়েছে দুর্ভোগ। এ দুর্ভোগ লাঘব হয় বিলিং সহকারীদের টেবিলে। এজন্য বিলিং সুপারভাইজার খালেদা আক্তারের সম্মতি আবশ্যক। এর পর সর্বশেষ ধাপে লাইনম্যানদের মর্জি অর্জন করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত। তা না হলে মিটার সংযোগ বিলম্বের অযুহাতের শেষ নেই।
উৎকোচ বাণিজ্যের শীর্ষ সুফলভোগীর তালিকায় রয়েছেন জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার ফারুক। এসব বিষয়ে অফিসের কর্তা ব্যক্তি ডিজিএম হারুন অর রশিদকে অভিযোগ করেও সুফল পান না গ্রাহকরা। অসহায় গ্রাহকরা নিরুপায় হয়েই সমস্ত উৎকোচ পর্ব চুকিয়েই নতুন মিটারের মালিক হচ্ছেন।
ভুক্তভোগী গ্রাহক রংপুর সদরের তপোধন ইউনিয়নের বাহার কাছনা শাহাপাড়া গ্রামের ঈদগাহ সংলগ্ন রেয়াজুল ইসলাম বলেন, উৎকোচের সব ধাপ চুকিয়ে মোট ১২ হাজার টাকা খরচ করে মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে আমি গঙ্গাচড়া জোনাল অফিস থেকে মিটার বরাদ্দ পেয়েছি। এর পরও লাইনম্যানরা মিটারটি লাগাতে আসিনি ১ মাসের অধিক সময়েও।
গঙ্গাচড়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম জানান, সিএমও হওয়া পর্যন্ত আমাকে ব্যয় করতে হয়েছে ৬ হাজার টাকা। অথচ আমি রশিদ পেয়েছি মাত্র ৯০০ টাকার। যা হলো সদস্য আবেদন ফি ১০০ টাকা, তারের মুল্য ৩০০ টাকা ও মিটার জামানত ৫০০ টাকা। অবশিষ্ট ৫ হাজার ১০০ টাকা উৎকোচ খাতে দিতে হয়েছে। ১৯ ফেব্রুয়ারিতে জামানতের টাকা জমা দিলেও অদ্যবধি তিনি বিদ্যুৎ সংযোগ (মিটার) পাননি।
গঙ্গাচড়ার উত্তর পানাপুকুর মালিপের বাজার গ্রামের বিষ্ণু চন্দ্র রায় জানান, গত ২ মার্চ তারের মুল্য বাবদ ৬৫০ টাকা এবং মিটার জামানত বাবদ ৫০০ টাকা জমা করা পর্যন্ত তার মোট ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার টাকা। তবুও তিনি এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ পাননি।
সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি বিদ্যুৎ সংযোগ (মিটার) পেয়েছেন গঙ্গাচড়া উপজেলা সদরের ধামুর গ্রামের নলিত চন্দ্র ৮ হাজার টাকা ব্যয়ে, একই গ্রামের জাহেদুল ইসলাম পেয়েছেন সাত হাজার টাকা ব্যয়ে, দুলাল পেয়েছেন ১২ হাজার টাকা ব্যয়ে এবং মিন্টু পেয়েছেন ৯ হাজার টাকা ব্যয়ে। প্রতিটি মিটারের জন্য ৭ হাজার টাকা ব্যয় করে গত মার্চ মাসে মিটার পেয়েছেন উপজেলা সদরের ভুটকা গ্রামের মৃত জছিম উদ্দিনের পুত্র লেবু মিয়া, হারুনের পুত্র নজরুল ইসলাম।
তারা জানান, মিটার নিতে অফিসয়াল ফিস প্রদানের পরও ডিজিএম, ইলেক্ট্রিশিয়ান, ইন্সপেক্টর, জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, সহকারী ইঞ্জিনিয়ার ও লাইনম্যানসহ সংশ্লিষ্ঠ সকলকে উৎকোচ প্রদান করতে হয়েছে। ফলে তাদের মিটার প্রতি ব্যয় করতে হয়েছে ৭ হাজার করে টাকা।
ভোগান্তির শিকার গ্রাহকদের মধ্যে আরো রয়েছেন উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের পূর্বকচুয়া গ্রামের শাহিনুর, তিনি গত ২৫ মার্চ তারিখে মিটার জামানতের টাকা অফিসে জমা করেন। এসময় পর্যন্ত ব্যয় ৮ হাজার টাকা হলেও মাত্র ১,৮৭০ টাকার রশিদ পেয়েছেন তিনি।
জোনাল অফিসের আওতাভুক্ত রংপুর সদরের তপোধন ইউনিয়নের ওমর কুটি মহব্বত খা গ্রামের বাবর আলীর পুত্র আব্দুস সালাম ও একই ইউনিয়নের বেনুঘাট ময়নাকুটি গ্রামের মৃত মকদুম আলীর পুত্র মাসুদার রহমানসহ অনেকে জানান তাদের নতুন মিটার পাওয়ার উৎকোচ কাহিনী।
নতুন মিটার পেতে গ্রাহকদের হয়রানি ও উৎকোচ গ্রহণ প্রসঙ্গে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর গঙ্গাচড়া জোনাল অফিসের ডিজিএম হারুন-অর-রশিদ উৎকোচ নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। একই বিষয়ে রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনালে ম্যানেজার (জিএম) কে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কেএইচ





