বাংলাদেশের সড়কগুলো এখন হয়ে উঠেছে এশিয়ায় অন্যতম প্রাণঘাতী। যানবাহন কম হলেও দুর্ঘটনা বেশি। প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২১ হাজারের বেশি মানুষ।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিনই সড়কে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। গত ঈদুল আজহার আগে-পরে ১২ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪৮ জন মারা গেছেন। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবারও ঢাকাসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে প্রাণ গেছে পাঁচজনের।

জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সালকে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশসহ সদস্যদেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু পাঁচ বছরের বেশি পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেনি।

দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা কমাতে আলাদা বাজেটও নেই। এভাবে দুর্ঘটনা কমানো যায় না। সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত তথ্যই তো দেশে কারও কাছে নেই।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ২১ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। তবে বাংলাদেশের যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে একই বছরে এই সংখ্যা সাড়ে আট হাজার। তারা মূলত সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করে। আর সরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ৩৭৬।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত গত বছরের মেডিকেল বুলেটিনে ৪০৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য
কমপ্লেক্স, ৬২টি জেলা হাসপাতাল, ১৪টি মেডিকেল কলেজ, ১০টি বিশেষায়িত হাসপাতালে ২০১৪ সালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বলা হয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে সর্বাধিক ৬৬ হাজার ৭৮৮ জন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার। জেলা হাসপাতালের দুর্ঘটনায় ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৮ হাজার ২৩৫, যা শীর্ষ দশ কারণের মধ্যে তৃতীয়। আর উপজেলা পর্যায়ে দুর্ঘটনার রোগী ভর্তি হয় প্রায় ৫১ হাজার, যা শীর্ষ দশের মধ্যে পঞ্চম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে এশিয়ায় বাংলাদেশ সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের ওপরে আছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। কিন্তু এই দেশগুলোর প্রতিটিতে যানবাহনের সংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। আর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম।

২০১৪ সালের তথ্য ধরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গবেষণা করেছে। সে হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩৩টি যানবাহন রয়েছে। চীনে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য রয়েছে ১৮ হাজার যানবাহন। ভারতে প্রায় ১৩ হাজার। আর পাকিস্তানে পাঁচ হাজার। থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় প্রতি দুজনে একটি করে যানবাহন রয়েছে। এই দেশগুলোতে জনসংখ্যাও প্রচুর। যানবাহনের হিসাব দেওয়া হয়েছে মোটরসাইকেলসহ।

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব খুব বেশি। পথচারীরা এখন ঝুঁকির শেষ সীমানায়। দেশ যখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার পর্যায়ে পৌঁছাবে, তখন যানবাহন বহুগুণ বাড়বে। আর যান ও মানুষ যত বাড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তত বাড়ে। যদিও মানুষের প্রাণহানি নির্ভর করে যানবাহনের গতির ওপর।

দুর্ঘটনার সব উপাদান বিদ্যমান
গবেষণার ফল ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনার মূল অনুষঙ্গ চারটি। এগুলো হচ্ছে চালক, যানবাহন, সড়ক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ।
২০০৭ সালে করা ব্র্যাকের করা এক গবেষণা অনুসারে ভারী যানবাহনের ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ চালকই ‘ওস্তাদে’র (মূল চালকের) সহকারী থেকে চালক হয়েছেন। বিআরটিএর তথ্য অনুসারে, দেশে ভারী যানবাহনের প্রায় আড়াই লাখ চালক রয়েছেন। তাঁদের ১ লাখ ৯০ হাজার লাইসেন্স পেয়েছেন পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে। তাঁরা লাইসেন্স পান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের দেওয়া তালিকা ধরে।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে প্রায় ২৭ লাখ। এর মধ্যে অন্তত ৪ লাখের ফিটনেস সনদ নেই। আর যেসব যানের সনদ আছে, সেগুলোর বেশির ভাগকে দেওয়া হয়েছে অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। কারণ, মোটরযান আইনে যানবাহনের ৫০টির বেশি কারিগরি পরীক্ষা নিশ্চিত করেই চলাচলের সনদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এসব যাচাই করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে।

সড়কের অবস্থা দিন দিন কিছুটা উন্নতি হচ্ছে। দুটি মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করে এর মাঝখানে সড়ক বিভাজক দেওয়া হয়েছে। এতে মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা কমে এসেছে। সরকার দুর্ঘটনা কমাতে ১৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক সোজা করার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। তবে এখনো অনেক সড়ক ভাঙাচোরা, সংকেতও ঠিকভাবে নেই।

পারিপার্শ্বিক অবস্থা বলতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কের পাশের লোকালয়ের অবস্থান ও মানুষের সচেতনতার বিষয়টি। দ্রুত গতির যানের সঙ্গে নছিমন, করিমন, অটোরিকশাসহ অন্তত ১৫ ধরনের ধীরগতির যান চলে মহাসড়কে। গ্রামীণ সড়ক হঠাৎ করে মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়।

সঠিক তথ্য নেই সরকারের কাছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সবার আগে দরকার সঠিক তথ্য। কিন্তু সরকারের কাছে সঠিক তথ্যই নেই। নেই উদ্যোগও।
সরকারি তথ্যের উৎস পুলিশ। সড়ক দুর্ঘটনার পর মামলা হলেই পুলিশ তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। ভুক্তভোগী কেউ মামলা না করলে কিংবা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে ফেললে পুলিশের খাতায় কোনো তথ্য থাকে না। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে কেউ মারা গেলে সেই হিসাবও পুলিশের কাছে থাকে না।

পুলিশ সদস্য ও ভুক্তভোগী ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনায় মামলা হলে দুর্ঘটনার কারণসহ ৬৪টি বিষয়সংবলিত একটি ফরম পূরণ করতে হয় পুলিশকে। তথ্য সংরক্ষণ ও মামলা তদন্তে পুলিশের আলাদা কোনো সদস্য নেই। ফলে পুলিশ মামলা করার এবং তথ্য সংরক্ষণের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। এ জন্যই পুলিশের তৈরি করা হিসাবে দিন দিন দুর্ঘটনার সংখ্যা ও হতাহতের পরিমাণ কমছে।

বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই পারের প্রায় ৩৯ কিলোমিটার মহাসড়কের দুর্ঘটনার হিসাব পুলিশ ও সেতু কর্তৃপক্ষ আলাদাভাবে সংরক্ষণ করে। দুই সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতু কর্তৃপক্ষের হিসাবে ২০১৩ সালে এই এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে ১৭২টি। কিন্তু পুলিশের নথিতে দুর্ঘটনার সংখ্যা মাত্র আট। সেতু বিভাগের হিসাবে এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা ৩৯৫। আর পুলিশের হিসাবে ১৪।

২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার সংখ্যার দিক থেকে সেতু বিভাগের হিসাব পুলিশের তুলনায় ৯ গুণ বেশি। আর হতাহতের সংখ্যার দিক থেকে সেতু বিভাগের হিসাব ১২ গুণ বেশি।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, আগে জানতে হবে কোন সড়কে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এরপর জানতে হবে কারণ। তারপর পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে কোনোটারই কি সঠিক তথ্য আছে?

চালকের বিশ্রামের সুযোগ নেই

বিআরটিএর হিসাবে, বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে ২৭ লাখ ১৩ হাজার। ২০১৫ সাল পর্যন্ত চালকের লাইসেন্স আছে ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৩৮৩। অর্থাৎ যানবাহনের তুলনায় প্রায় ১১ লাখ লাইসেন্স কম। সব মিলিয়ে পেশাদার চালকের লাইসেন্স আছে প্রায় সাত লাখ। অথচ পেশাদার চালকের সাহায্যে চলে এমন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের ভারী যানবাহন চালকদের পরিচালিত গবেষণা অনুসারে, প্রত্যেক চালক দৈনিক গড়ে ৯ দশমিক ২ ঘণ্টা যানবাহন চালান। মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যানজটের কারণে অনেক সময় চালকের যাত্রা ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ঠেকে। শ্রম আইনে একজন চালকের কর্মঘণ্টা হওয়ার কথা ৮। বাণিজ্যিক যান ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, বাস-মিনিবাস, লরি ২৪ ঘণ্টাই চলে। সে ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রতিটি যানের পেছনে গড়ে তিনজন করে চালকের প্রয়োজন হয়।

বিআরটিএর হিসাবে, দেশে ভারী যানবাহন আছে ৩ লাখ ২৩ হাজার। সে ক্ষেত্রে শুধু ভারী যানবাহনের চালক দরকার প্রায় ১০ লাখ। কিন্তু আছে মাত্র ৩ লাখ ৮০ হাজার।
বড় পরিবহন কোম্পানিগুলোর মালিকেরা একটি বাসের পেছনে দুজন করে চালক রাখেন, যাতে একজন চালক এক দিন বিশ্রামের সুযোগ পান। কিন্তু চালকেরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একটানা এক সপ্তাহ কাজ করে এক সপ্তাহ বিশ্রাম নেন।

দক্ষ চালক তৈরির ব্যবস্থা নেই

সড়ক নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় দায়িত্ব যার, সেই চালককেই যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে দিনের পর দিন। বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ১ লাখ ৯০ হাজার ভারী যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের তালিকা ধরে। যথাযথ যোগ্যতার পরীক্ষা ছাড়াই এই লাইসেন্সগুলো দেওয়া হয়েছে।
চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর যথাযথ পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন হাইকোর্ট। তবে পেশাদার চালকের লাইসেন্স নবায়নে এখনো আইন মানা হচ্ছে না।

মোটরযান আইনে তিন বছর পরপর যোগ্যতার পরীক্ষা দিয়ে পেশাদার লাইসেন্স নবায়ন করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনের চাপে এখন বিআরটিএ একজন মোটরযান পরিদর্শকের অধীনে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই নবায়ন দিচ্ছে।

সারা দেশে প্রতিটি জেলা ও টার্মিনালে শ্রমিক ইউনিয়ন রয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে রয়েছে ফেডারেশন। ফেডারেশন ও ইউনিয়নের জন্য প্রতিটি বাণিজ্যিক যান থেকে দৈনিক ৩০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। কোটি কোটি টাকা চাঁদা তোলার পরও তাদের কোনো চালক প্রশিক্ষণের কর্মসূচি নেই।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চালকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে কিছু টাকা দেয়। তবে তা খুবই সামান্য। ব্র্যাকসহ কিছু বেসরকারি সংস্থা সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে।
সারা দেশে সরকারের পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির ২২টি ট্রেনিং সেন্টার আছে। তবে এর অন্তত অর্ধেকই অচল। ঢাকা, গাজীপুরসহ কয়েকটি সেন্টারে যাঁরা শিখতে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই অপেশাদার চালক।

এই বিষয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, তাঁরা চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা সৃষ্টির কাজ নিজের মতো করে করেন। কিন্তু সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে তা আরও সহজ হয়ে যেত। দেশের ৬৪টি জেলায় সরকারি হলরুম আছে। চাইলে সেখানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায়।

মোটরযান আইন করতে চার বছর
সড়ক পরিবহন ও চলাচল আইন করতেই সরকার চার বছর পার করে দিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১২ সালে এই আইনের খসড়া তৈরি করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু এখনো সেটি আইনে পরিণত হয়নি। বর্তমানে মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩-এর মাধ্যমে চলছে পরিবহন খাত। এটিতে শাস্তির বিধান

খুবই কম। তাই সংশোধনের দাবি দীর্ঘদিনের।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খসড়া আইনে শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা না-করা নিয়ে এখনো ঘুরপাক খাচ্ছে মন্ত্রণালয়।

বিদ্যমান আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির জন্য চালক দায়ী হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। শুরুতে খসড়া আইনে তা পাঁচ বছর করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি পাঁচ লাখ টাকা শাস্তির বিধান রাখা হয়। নাগরিক সমাজকে মতামতের জন্য ডাকা হলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু মালিক-শ্রমিকদের চাপে সরকার পিছিয়ে এসেছে।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের ১০ বছর শাস্তি চেয়েছিলেন। পাশাপাশি এর মামলা অজামিনযোগ্য ধারায় করা উচিত। তাঁদের প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে কি না, তা তাঁরা জানেন না।

দোষী ব্যক্তির শাস্তি হয় না

পুলিশের দেওয়া সড়ক দুর্ঘটনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই। সংস্থাটির ২০১৫ সালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুলিশ দুর্ঘটনার যেসব কারণ উল্লেখ করেছে, তার ৯০ শতাংশের ক্ষেত্রেই কোনো-না-কোনোভাবে চালক দায়ী। পুলিশের তথ্য বলছে, অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানো ও অন্য যানবাহনকে বিপজ্জনকভাবে অতিক্রম (ওভারটেকিং)—এই তিন কারণেই ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটে। আর তিনটিই নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব চালকের।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চালক দায়ী হলেও তাঁদের শাস্তি হওয়ার নজির কম। চলচ্চিত্র পরিচালক তারেক মাসুদ ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ২০১১ সালে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটিকে ধাক্কা দেওয়া বাসের চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর মুক্তির দাবিতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বে মালিক-শ্রমিকেরা ঢাকায় সমাবেশসহ সারা দেশে একাধিকবার ধর্মঘট পালন করেন। এখন সেই চালক জমির জামিনে মুক্ত।

এ বিষয়ে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, দুর্ঘটনায় চালক বা মালিকের সাজা হয় না। আইনে এটি জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ থাকায় অপরাধীরা জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। এরপর মামলা চলে বছরের পর বছর। এতে ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। মামলা আর এগোয় না।(সুত্র প্রথম আলো)

এমবিএইচ