ঘটনার শুরু ২০০৭ সালে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে রুরাল ট্রান্সপোর্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (আরটিআইপি) প্রকল্পের আওতায় ধর্মপাশা-জয়শ্রী সড়কের ১০ কিলোমিটার উন্নয়নের বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ২১ কোটি টাকা। তখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রজেক্ট বিল্ডার্স লিমিটেডকে এ কাজ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিকিভাগ কাজও শেষ করতে পারেনি।
সড়ক নির্মাণের কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) উপ-পরিচালক তামজীদ সারোয়ার। বুধবার সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা থানায় মামলা দায়েরের পর ঢাকার মিরপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কোটি টাকা আত্মসাতের সেই ঘটনার অনুসন্ধানে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও আলোকচিত্র দেখে জানা গেছে, দুর্নীতির শিকার সড়কের অতীত ও বর্তমান অবস্থা।

এ কারণে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২০১০ সালে ঠিকাদার মনোনীত হয় মঞ্জুরুল আহসান অ্যান্ড কোং নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের ১৩ কোটি ২০ লাখ টাকায় ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার অংশের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ২০১২ সালের জুনে কাজ শেষ করার কথা ছিল। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে তারা কাজ শুরু করেও যথাসময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়।
অভিযোগ আছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধেক কাজ বাকি থাকায় ওই প্রকল্পের টাকা ফেরত যাওয়ার উপক্রম হয়। কিন্তু ঠিকাদার, প্রজেক্টের প্রকৌশলী ও স্থানীয় ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্য ও তার পিএস এ পিএসের যোগসাজসে কাগজেপত্রে কাজ শেষ হয়েছে দেখিয়ে বিলের পুরো টাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু তখনই প্রকল্পধীন সড়কের একাধিক জায়গা দেবে যায়। ফলে হাওরে পানি বাড়লেই সে জায়গা পানিতে তলিয়ে যায়।
জেলা সদর থকে সড়ক পথ প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার দূরত্বে দূর্গম সীমান্ত এলাকায় যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে সড়কটির বরাদ্দে স্থানীয়দের মাঝে আশার আলো জাগে। কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরেও প্রায় ১০ বছরে তারা সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের শেষ দেখতে পাননি। বরং উন্নয়ন বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় জনগণ সরকারে ওপর বেশ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
বর্তমানেও সড়কের একাধিক স্থানে যান চলাচলের অবস্থা নেই। পায়ে হেঁটে চলাচলেও অনেক কষ্ট হয়। সেতুর দুই পাশে মাটি সরে গিয়ে সড়ক অনেক নিচে দেবে গেছে।
নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানায় স্থানীয় এমপির ছত্রছায়ায় থেকে পিএস রেজোয়ান আলী খান আর্নিক, এপিএস মো. শামীম আহমেদ মুরাদ, ঠিকাদার ও প্রকৌশলী তামজীদ সারোয়ার মিলে টাকা মেরে খেয়েছে। এমকি স্থানীয়রা এই লুটপাটের প্রতিরোধ করতে গিয়েও এমপির অনুসারী দুই ক্যাডারের হুমকির মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। লুটপাটের ভাগ পাওয়ার অভিযোগ এমপির লোকজনের বিরুদ্ধে থাকলেও শেষমেষ বলির পাঠা হয়েছেন প্রকৌশলী তামজীদ সারোয়ার।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের জয়শ্রী গ্রামের বাসিন্দা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘সড়ক অইতাছে দেইখ্যা মনে অইছিন আমরার ভাগ্য খুলছে। অহন দেহা যাইতাছে এই সড়ক আমরার মরণ ডাইক্কা আনতাছে। কত বছর যাইতাছে অহনো কাজ শেষ হইছে না। এহন যেই অবস্থা এইডারে কী সড়ক কওন যায়?’
জয়শ্রী ইউনিয়নের সানবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা প্রলয় বণিক হাসু জানান, সড়কের মাটি যেভাবে সরে যাচ্ছে তাতে কিছু দিন পরে এটি সড়ক না হাওর বোঝা মুশকিল হবে।
জয়শ্রী গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম, সাগর চন্দ্র সরকার, নুরুল হুদা জানান, সড়ক নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্টরা তড়িগড়ি যেনতেন ভাবে কাজ করেছে। সড়কে ঠিকমত মাটি ফেলা হয়নি। এমনকি সড়কের পাশে নিম্নমানের ব্লক ব্যবহার করায় তা হাওরের সামান্য পানির চাপে অনেক আগেই ব্লক ভেঙে ও ভেসে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের নাম্বারে একাধিক বার ফোন দিলে তিনি রিসিভ করেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
তার পিএস রেজোয়ান আলী খান আর্নিক বলেন, আমি কোনোভাবেই এ সড়কের কোনো দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত নই। আমি এই সড়কের ঠিকাদার নই, কোনো মেটেরিয়ালের সাপ্লাইয়ারও নই। এমনকি সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রকৌশলীও না। আমার দুর্নীতি করার তো সুযোগ নেই। এমপি মহোদয়ও এ বিষয়ে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট নয়। বরং তিনি সড়কের কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগে সংসদ সদস্য হিসেবে ডিও (ডিমান্ড অর্ডার) লেটার দিয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমপি সাহেবের নিকটাত্মীয় (মা) অসুস্থ। তিনি এ নিয়ে ব্যস্ত। তাই ফোন রিসিভ করতে পারছেন না।
এপিএস মো. শামীম আহমেদ মুরাদ বলেন, আমাকে মানুষ এমপি সাহেবের এপিএস হিসেবে মনে করেন। কিন্তু আমি কাগজে কলমে কোনো এপিএস নয়। আমি ধর্মপাশা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আমি এ সড়কের কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। বরং সড়কটির কাজ ভালোভাবে হওয়ার জন্য অনেক আন্দোলন করেছি। এটি আমার গ্রামের বাড়ির সড়ক।
এমবিএইচ





