‌‌‍মেঘ দেখে তুই করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’ এমন মন্ত্রবাণী মানুষের মনে এনে দিতে পারে অদম্য শক্তি। তারই এক প্রতি ফলন ঘটে হত দারিদ্র কুয়াকাটা উপকূলীয় অঞ্চলের তালতলী উপজেলার গাবতলী গ্রামের বিধবা নাজমার জীবনে।

স্বামীকে হারিয়ে যে হতাশার রাহুগ্রাস থেকে জীবনকে ছিনিয়ে এনে দেখায় সফলতার সূর্য্য। প্রকৃত জীবন যুদ্ধের সাথে তাল মিলিয়ে অদম্য ইচ্ছা শক্তি দিয়ে সন্তানদের বাবা হরোনোর ব্যথা ভুলাতে যাচ্ছেন। একবিঘা জমির ভিতরে শতাধিক কুল গাছ লাগিয়ে নিজ মেধাবুদ্ধি দিয়ে এনেছে সাফাল্যর মুখ। কোন কৃষি কর্মকর্তা ও অন্য চাষিদের পরার্মশ ছাড়াই প্রতিবছর লক্ষ টাকার মুখ দেখেন নাজমা বেগম।

Kuakata Pic-02

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুয়াকাটা উপকূলীয় অঞ্চলের তালতলী উপজেলার ২নং ছোটবগী ইউনিয়নের গাবতলী গ্রামে জিবন যোদ্ধা নাজমার বেগমের বসবাস। বেকার স্বামী লুৎফর রহমান ঘরে তার সংসার জীবন শুরু। দরিদ্র এ সংসারে সুখের মধুরতা খুব একটা আস্বাদন করতে পারেননি নাজমা বেগম। সময়ের পরিক্রমায় কোল জুড়ে এলো পর পর দু’টি ছেলে সন্তান। ফলে তাদের দাম্পত্য জীবনে যোগ হলো সুখের নতুন মাত্রা। কিন্তু নিয়তির সেই সুখটুকু বেশি দিন বাসা বাঁধেনি তাদের ঘরের চালায়।

কিছু দির পর লুৎফর রহমান হঠাৎ যক্ষাব্যাধিতে আক্রান্ত হলো। পর পর দুই বার স্ট্রোকে পা দুটিও অচল হয়ে পড়ে। সংসারে যৎসামান্য আয়ের টাকা ব্যয় হতো ওষুধ কিনতে। তার উপর ধার-কর্জ তো আছেই। একদিন নাজমার বাড়িতে এলাকার লোকজনের ভীড়। হঠাৎ এক বেদরদী বিকেল বেলায় নাজমার জীবন আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। ঘরের জানালা দিয়ে একটা আর্তচিৎকার ভেসে আসলো। নাজমার গগণবিদারী কান্নার অর্থ বুঝতে কারও সমস্যা হলো না। রোগে ভোগা স্বামী লুৎফর রহমান না ফেরার দেশে চলে গেলেন।

Kuakata Pic-04

এর পরেই দু’টি সন্তানের খাওন-খরচ, চিকিৎসা খরচ ও লেখাপাড়ার খরচ নিয়ে ভাবতে হয়। শুরু করে জীবন যুদ্ধ। নিজের মেধা খাটিয়ে আঙ্গিনার ১ বিঘা জমিতে নাজমা বেগম শুরু করেন কুল চাষ। খুলনার পোনা মাছের ব্যবসায়ীদের নৌকাযোগে শতাধিক কুল চারা সংগ্রহ করে দু’প্রজাতি বাউ কুলের চারা বাড়ির আঙ্গিনায় রোপণ করেন। সনাতন পদ্ধতিতে কুল চাষ ও পরিচর্যা করেও প্রথম বছর তিনি সন্তোষজনক ফলন পাওয়া শুরু করেন । তা দেখে স্থানীয়রা হতভাগ একজন মহিলার পক্ষে এটা কি করে হয়।

তবে স্থানীয়রা জানান, আধুনিক কুল চাষ পদ্ধতি প্রয়োগ করলে হয়তো আরও বেশির ফলন হতো। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে ব্লক সুপারভাইজার নিয়োজিত থাকলেও তাদের কাছ থেকে কোন পরামর্শ কিংবা সহযোগিতা পাননি বলে জানান নাজমা বেগম।

প্রতি বছর শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিনে গাছে ফুল ধরা শুরু করে। অন্যদিকে পৌষ, মাঘ ও ফাল্গনে বিক্রির জন্য ফল তোলা হয়। এক মৌসুমে কুল গাছে ২/৩ বার কীটনাশক ব্যবহার করেন তিনি। অপরদিকে গাছের গোড়ায় সার ব্যবহার করেন বছরে মাত্র একবার। এতে তার খরচ হয় প্রায় ৩/৪ হাজার টাকা। কিন্তু দুঃখজনক এতো শ্রমের পরও তিনি পান না ন্যায্য মূল্য। সঠিকভাবে হয় না বাজারজাতকরণ। ফলে ৩০-৫০ টাকা কেজি দরে কুল বিক্রি করতে হয় স্থানীয় বাজারে। এতে প্রতি মৌসুমে তার বিক্রি হয় প্রায় ৫০-৭০ হাজার টাকা। প্রথমবারের সফলতায় স্বামীহারা নাজমার শোক বিধ্বস্ত মুখে হাসির ঝলক ফুটে ওঠলো।

সাফল্য নাজমা বেগম সাথে কুল চাষ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজের বুদ্ধি খাডাইয়া এই কুলের চাষ হরছি। ম্যালা কষ্ঠ গ্যাছে এইয়ার পিছে। নাওয়া নাই, খাওয়া নাই শুধু এই ক্ষ্যাত লইয়া পইড়্যা রইছি। এহন আল্লায় মোর মোহের (মুখের) দিকে এ্যাকটু ফিরর্যা তাকাইছে।

এলাকার প্রবীণ শিক্ষক নুরুল ইসলাম’র সাথে এ বিষয়ে আলাপ হলে তিনি বলেন, 'ওর স্বামী মারা যাওয়ার পর আমরাও দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। কী হবে মেয়েটার ভবিষ্যৎ? আমরা যার যার মতো করে সহায়তা ও পরামর্শ দিয়েছি। এখন কুল চাষ করে ওর সংসার চলে। তবে আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষ করলে কুলের ফলন হয়ত আরও বেশি হতো।

ছোটবগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তৌফিকুজ্জামান তনু বলেন, স্বামীকে হারিয়ে নাজমা সাময়িক ভেঙ্গে পড়লেও নিরুপায় হননি।তবে কুল চাষে সনাতন পদ্ধতি ব্যবহারে ফল কম এসেছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে কৃষির সুপারভাইজার থাকে কিন্তু আমার এ জায়গায় তাদের মুখ দেখি নাই। অধিক ফলনের জন্য নাজমার জন্য কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি পেতে আমি সহায়তা করব।

তালতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বদরুল আলম’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি নাজমা বেগম’র কুল চাষ সম্পর্কে বলেন, আমরা এরকম স্বউদ্যোগী চাষীর পাশে দাঁড়াতে বদ্ধপরিকর। অতি শীঘ্রই ওই এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় কৃষি সহায়তা প্রদান করা হবে।

এমবিএইচ