নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক- অভিভাবকদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে।

অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান শিক্ষক বিষ্ণপদ সাহা ২৮/০৪/১৬ তারিখে নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। জেলা শহরের গুরুত্বপুর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রায় অনুপস্থিত থাকেন। যার কারনে দাপ্তরিক কাজকর্মসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে কারনে অকারনে শিক্ষক-কর্মচারী ও অভিভাবকদের সাথে অসৌজন্যমুলক আচরণ করে থাকেন। প্রধান শিক্ষক যোগদানের পর থেকে মাঝে মধ্যে স্কুলে আসেন। যখন কোন স্কুলর নিয়োগ সংক্রান্ত পরীক্ষা থাকে তখনই স্কুলে উপস্থিত থাকেন। অন্যান্য সময় দেশের বাড়িতে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহরের ভওয়াখালী এলাকার লাভলী খানম জানান, তিনি পাসপোর্ট কাগজপত্র সত্যায়িত করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সত্যায়িত করে দেননি। বরং উল্টাপাল্টা কথাবার্তা বলেছেন। ওই শিক্ষকের কথাবার্তা মোটেও ভাল না।

গণমাধ্যমকর্মী সাথী তালুকদার জানান, প্রধান শিক্ষক প্রায় কর্মস্থলে থাকেন না। জরুরী প্রয়োজনে গেলেও পাওয়া যায় না। প্রধান শিক্ষক হয়ে তিনি খুব দাম্ভিকতা দেখান। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে তিন লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে নড়াইল জেলা প্রশাসকের বরাবর লিখিতভাবে করেছেন জনৈক আমিনুল ইসলাম।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয় যে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদ্যালয়ে ল্যাব: যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, রাসায়নিক দ্রব্যাদি ক্রয়ে ৩৮ হাজার টাকা, শিক্ষা উপকরণ ক্রয় বাবদ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা, আনুসাঙ্গিক ২৮ হাজার ৬৫০ টাকা, ল্যাব: যন্ত্রপাতি ক্রয় ৪৭ হাজার ৫০০ টাকা, ব্যবহার্য বাবদ ২০ হাজার টাকা, বইপত্র ও সাময়িকী বাবদ ৯হাজার ৫৫০ টাকার বিল উত্তোলন করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, নড়াইল ও ঢাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের ভাউচার দাখিল করে বিল উত্তোলন করলেও প্রকৃতপক্ষে কোন কিছুই ক্রয় করেননি। ক্রয় সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি কমিটি থাকলেও ওই কমিটির সদস্যরা কিছুই জানেন না।

জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসসূত্রে জানাগেছে, ৩০/০৫/১৬ তারিখে ল্যাব: যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ১.৫২ হাজার টাকা এবং ৩১/০৫/১৬ তারিখে ল্যাব: যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ৪৭,হাজার ৫০০ টাকার ভাউচার দাখিল করা হয়েছে।

অন্যদিকে ল্যাবরটরী যন্ত্রপাতি ও রাসায়নিক দ্রবাদি ক্রয় কমিটির সদস্যর শিক্ষক শক্তিপদ বিশ্বাস, মোঃ আলমগীর হোসেন, সবুজ কুমার সাহা ও মামুন-অর-রশীদের সাথে কথা বলে জানাগেছে, এসব ক্রয় সম্পর্কে সঠিকভাবে জানেন না। ক্রয় কমিটির সদস্য হলেও অনেক সময় কেনাকাটার বিষয়ে জানানো হয় না। আবার কখনো কখনো স্বাক্ষর করে নেয়া হয়। তবে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের অধীনে চাকুরী করায় ভয়ে মোবাইলে অনেক কথাই বলতে নারাজ তারা।

৩০/০৫/১৬ তারিখে শিক্ষা উপকরণ ক্রয় বাবদ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকার ভাউচার দাখিল করে টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা উপকরণ ক্রয় কমিটির সদস্য রয়েছেন কানাই লাল বিশ্বাস, আসালম হোসেন, মঞ্জুর হাসান ও আবুজাহিদ। এই কমিটির তিনজন সদস্যের সাথে মুঠোফোনে কথা বলেও ক্রয় সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না বলে জানান।

৩১/০৫/১৬ তারিখে অপর একটি ভাউচারে বইপত্র ও সাময়িকী ক্রয় বাবদ ৯হাজার ৫৫০ টাকার ভাউচার দাখিল করে টাকা উত্তোলণ করা হয়েছে। কিন্তু বইপত্র সাময়িকী ক্রয় কমিটির সদস্য লাইব্রেরীর দায়িত্বে থাকা শিক্ষক অমল কান্তি নাগ মুঠো ফোনে জানান, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিনি কোন বই কেনেননি। তবে প্রধান শিক্ষক কিনেছে কিনা জানেননা। লাইব্রেরীতে কোন বই দেয়া হয়নি।

৩১/০৫/১৬ তারিখের আরেকটি ভাউচারে ব্যবহার্য ক্রয় বাবদ ২০হাজার টাকার ভাউচার দাখিল করে টাকা উত্তোলণ করা হয়েছে। কিন্তু ব্যবহার্য দ্রব্যাদি ক্রয় কমিটির সদস্য (দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক) নাহিদা আহম্মেদ এ সব ব্যাপারে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কথা বলতে রাজি হয়নি। তিনি বলেন, আমি নারী মানুষ, কি বলতে কি বলব। যদি কেউ অপরাধ করে থাকেন, আল্লাহ তার বিচার করবে’।

এদিকে ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ ১৯ হাজার চারশত পঞ্চাশ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদনের পর নড়াইল সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ ফজলুল হকের ওপর তদন্তভার দেয়া হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ ফজলুল হক জানান, তিনি তদন্তকাজ শুরু করবেন। তদন্ত করে অভিযোগ সম্পর্কে যে রিপোর্ট পাওয়া যাবে তাই জমা দিবেন।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিষ্ণুপদ বিশ্বাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি 'টাইমনিউজ'কে জানান, কোন কিছু কিনতে গেলে ক্রয় কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনা করে কেনা হয়। কোন কিছুর প্রয়োজন হলে কিনে কাজ চালানো হয়। পরে বাজেট আসলে এজি (হিসাব রক্ষণ অফিস) অফিসে ভাউচার দিয়ে টাকা উত্তোলণ করা হয়।

অন্যান্য অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ সত্য নয়’।

উজ্জ্বল রায়/জারিফ