মানিকছড়ি গিরিমৈত্রী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফরম বিক্রিত অর্থ প্রিন্সিপাল কর্তৃক আত্মসাৎ এবং শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির তালিকা প্রণোনয়নে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে দু’বার তালিকায় রদ-বদল স্বত্বেও এতিম ও হত-দরিদ্ররা এখনো বঞ্চিত। প্রিন্সিপালের দাবী ছাত্রলীগের আবদার রক্ষায় কিছুটা হের-ফের!

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মানিকছড়ি গিরিমৈত্রী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ইচ্ছুক আটশতাধিক শিক্ষার্থীর নিকট ভর্তি বিক্রি বাবদ আশি হাজার টাকা কলেজের ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে প্রিন্সিপাল নিজেই পকেটস্থ করেন! এছাড়া ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে উপবৃত্তির তালিকার জন্য আটশতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪০৯ জনের আবেদন গত ২৯ সেপ্টেম্বর বাছাই কমিটি (প্রিন্সিপালসহ)কর্তৃক যাছাই-বাছাই শেষে গত ১ অক্টোবর প্রিন্সিপালের জন্য ২০ কোটা রেখে ১৫৮ জনের তালিকা প্রিন্সিপালের স্বাক্ষরে প্রকাশ করা হয়।


প্রকাশিত তালিকায় নাম দেখে মনোনিত শিক্ষার্থীরা ২ অক্টোবর থেকে মোবাইলে হিসাব খুলতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে প্রিন্সিপালের নিদের্শে নোটিশ বোর্ড থেকে তালিকা সরিয়ে নেয় সংশ্লিষ্টরা! ফলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহলে দেখা দেয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। পরদিন কলেজ ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ ওই তালিকায় বাদপড়া শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ২০ জনের একটি তালিকা নিয়ে প্রিন্সিপালের সাথে দেখা করেন এবং এ তা সংযুক্তের দাবী জানান। ফলে প্রিন্সিপাল কাউকে কিছুই না জানিয়ে এবং কলেজ পরিচালনা কমিটি অবজ্ঞা করে ২/৩ দিন ধরে পূর্বের তালিকায় ব্যাপক রদ-বদল করে তা ৫ অক্টোবর প্রকাশ করেন। প্রকাশিত এ তালিকা নিয়ে শুরু হয় আবারও ব্যাপক সমালোচনা।

২য় তালিকায় ১৬৮ জন সুবিধাভোগী (ছাত্র-৪৮,ছাত্রী-১২০) ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ১০০ জন উপজাতি এবং মাত্র ৬৮জন বাঙ্গালী ছেলে-মেয়ের নাম থাকায় আবারও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেন বাদপড়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। উপজেলার অজপাড়া গা কালাপানির স্কুলপাড়ার হত-দরিদ্র পরিবারের সন্তান (রোজিনা ছন্দনাম) জানান, আমার পিতা একজন দিনমজুর। অনেক আশা নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। উপবৃত্তির প্রথম তালিকায় আমার নাম ছিল। আমি ডাচ্ বাংলা ব্যাংকে হিসাব খোলেছি। কিন্তু আজ (৬অক্টোবর) কলেজে এসে জানতে পারলাম ২য় তালিকায় আমার নাম নেই! পিতৃহীন জনৈক শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন, এতিম হয়েও প্রিন্সিপালের তালিকায় নাম অর্ন্তভূক্ত হলো না! অথচ বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ছাত্র নেতাদের চাপে প্রিন্সিপাল পাহাড়ী-বাঙ্গালী বিভাজন করেছে।

প্রিন্সিপাল নিজের অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতে নেতাদেরকে খুশি করেছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু যুবলীগ নেতা রনি দাশের কন্যা শ্রাবণী দাশ বলেন, আমাদের পরিবার আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত, আমার পিতা যুবলীগ নেতাও বটে। সম্প্রতিকালে সড়ক দূর্ঘটনায় আমার পিতার হাত-পা ভেঙে এখন ঘরে বসা। টাকার অভাবে পায়ে সংযুক্ত রিং খুলতে পারছেনা। আবেদনে আমার পরিবারের বর্ণনা থাকা স্বত্বেও আমার নাম প্রথম তালিকা থেকে প্রিন্সিপাল নিজেই বাতিল করে দেন!
অন্যদিকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফরম ( প্রতি ফরম ১শত টাকা) বিক্রিত আয়ের ৮০ হাজার টাকা ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে প্রিন্সিপাল নিজেই তা আত্মসাৎ (পকেটস্থ) করেন বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট ম্যানেজিং কমিটির একাধিক সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ম্যানেজিং কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ গত ৬ মাসে(দায়িত্বকালীণ) কলেজ পরিচালনার নিয়ম-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে কলেজে একক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছেন। অথচ পূর্বের অধ্যক্ষ(সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত) ভর্তি ফরম বিক্রির আয় কলেজ হিসাবে জমাপূর্বক খরচ দেখিয়ে তা আবার তুলে ভর্তি সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করতেন। আর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করলেন তার উল্টো!

কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল মংচাইঞো মারমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, উপবৃত্তির প্রথম তালিকায় চাকুরীজীবি ও বৃত্তশালীদের সন্তানদের নাম ভূলক্রমে অর্ন্তভূক্ত হয়েছিল। ফলে তা স্থগিত করে আবার চুল-ছেড়া বিশ্লেষণ শেষে গত ৫ অক্টোবর চুড়ান্ত তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কলেজ ছাত্রলীগ নেতারা ২০ জনের জন্য সুপারিশ করায় তা রাখতে গিয়ে কিছুটা হের-ফের হতে পারে। তবে স্বচ্ছভাবে তালিকা করা চেষ্টা করেছি। ভর্তি ফরমের টাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই টাকা ভর্তি সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যয় করা হয়েছে।

কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য ও শিক্ষানুরাগি এম.ই. আজাদ চৌধুরী বাবুল বলেন, কলেজ অধ্যক্ষ ভর্তি কিংবা উপবৃত্তি তালিকার বিষয়ে ম্যানেজিং কমিটির কাউকে কিছুই জানায়নি। এতিম ও হত-দরিদ্র ছেলে-মেয়েদেরকে উপবৃত্তি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হলো! পরিচালনা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার যুথিকা সরকার মানিকছড়ি বার্তাকে বলেন, কলেজের ভর্তি ফরম বিক্রি আয় কিংবা উপবৃত্তির তালিকার বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল আমাকে কিছুই বলেনি। এখন এসব অনিয়মের বিষয়ে শুনছি। খোঁজ-খবর নিয়ে বিষয়টি সর্ম্পকে ব্যবস্থা নেবো।

এসএ