রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের সাথে করা চুক্তি বা সম্মতিপত্রের কাজ শেষের কোন সময়সীমা নেই। তার ভিতরে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা 'ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন' যেটা তিন সপ্তাহের মধ্যে করার কথা। কিন্তু দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোন প্রকার কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
তাদের ফেরানোর পরবর্তী বাস্তব ব্যবস্থা বা ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও এর শর্তাবলী বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর)-এর খসড়া চূড়ান্ত হয়নি এখনো। এখনো চিঠি চালাচালির মধ্যে আছে দুই দেশ।
কিন্তু কাজের এই ধীরগতির মধ্যেও থেমে নেই রোহিঙ্গাদের আসার ঢল। আসার মধ্যে ধীরগতি থাকলেও কোন প্রকারেই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা থামেছে না। বরং মাঝে মধ্যে সর্বোচ্চ গতিসীমা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা।
স্থানীয় প্রাপ্ত তথ্যমতে, শুধু চুক্তির পরে এ পর্যন্ত প্রায় ৮-১০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উল্লেখ্য চুক্তি হয়েছে ২৩ নভেম্বর। চুক্তি বাস্তবায়নের ধীরগতি আর রোহিঙ্গাদের আসা ক্রমান্বয়ে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে।
গতকাল শনিবার ১৯২ জন রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটে কক্সবাজার টেকনাফে। যাদের ভাষ্যমতে সীমান্তের ওপারে এখনো হাজার হাজার রোহিঙ্গা অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশে প্রবেশের। যারা বর্তমানে কঠিন মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এখন আসার কারণ জানতে চাইলে বলে মিয়ানমারে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠির নির্যাতন থেকে বাঁচতে। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, নির্যাতন কি আদৌ বন্ধ হয়েছে? আর চুক্তি কি নেওয়ার জন্যই হয়েছে?।
আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্টতার অভাব নিয়ে করা ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে করা সমঝোতা চুক্তির পরে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা যেমন জাতিসংঘসহ বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা এবং এমিনেস্টি ইন্টারন্যাশানালের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তাদের মতে, এটা সম্পূর্ণ অনিরাপদ প্রত্যাবাসন। এই চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে বড় অভাব 'সময়' এবং 'নিশ্চয়তার'।
বিশ্ব বিবেক জাতিসংঘ এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করা বৈশ্বিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম বলছে রাখাইনে উত্তেজনা কমলেও কেবল নভেম্বরেই ২০ হাজারের বেশি এবং চলতি মাসের শুরুর দিনগুলোতে কয়েক শ’ নবাগত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ফলে গত ২৫শে আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া (নবাগত) মিয়ানমার নাগরিকের সংখ্যা ৬ লাখ ৪৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
এখানে আগে থেকে আশ্রয়ে রয়েছে আরো প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে ১০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকের বাড়তি বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বৈশ্বিক চাপে নিজ দেশের নাগরিকদের ফেরাতে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হলেও এটির বাস্তবায়নে দেশটির আন্তরিকতা নিয়ে আগাগোড়ায় সংশয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এ কারণেই এখন চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দুটি শর্ত ৩ সপ্তাহের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং দু’মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুরোপুরি শুরু করার ‘বাধ্যবাধকতা’ থেকে নেপি’ড সরে আসতে চাইছে।
এজন্য চুক্তি সইয়ের ২ সপ্তাহ পার হলেও জয়েন্ট ওয়ার্কি গ্রুপ গঠনে টার্মস অব রেফারেন্স বা টিওআরই চূড়ান্ত করা যায়নি। ঢাকার কর্মকর্তারা অবশ্য বিষয়টির সঙ্গে লেগে আছেন। তারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আহ্বানের কথাও জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ আলোচনার পর রাখাইনের বর্বরতা থেকে প্রাণে বাঁচতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সঙ্গে ‘অ্যারেঞ্জমেন্টটি সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও দেশটির স্টেট কাউন্সেলর দপ্তরের মন্ত্রী চাও থিন সোয়ে। বহুল আলোচিত ওই চুক্তিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর কথা থাকলেও কত দিনের মধ্যে তা পুরোপুরি সম্পন্ন হবে সে সংক্রান্ত কোনো সময়সীমা নেই।
মিয়ানমারের ইচ্ছায় এবং চীনের ‘মধ্যস্থতা’য় ১৯৯২ সালে সই হওয়া দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার চেতনায় নতুন ওই চুক্তিটি সই হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
সমলোচকরা এ-ও বলছে, ২০১৬ সালের অক্টোবরের পরে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরানোর চুক্তি করে আগের ৪ লাখ মিয়ানমার নাগরিকের ফেরানোর আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।
তাছাড়া, চুক্তি না মানলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ব্যবস্থা বা পদক্ষেপ নেয়া যাবে কি-না চুক্তিতে তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো ক্লজ বা ধারা নেই!
জেড





