দীর্ঘ ৩ বছর ধরে ঘোষণাতেই ঝুলে আছে কুষ্টিয়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতকরণ কার্যক্রম। প্রতিশ্রুতির ৩ বছর পার হলেও সিটি কর্পোরেশনের কোন কার্যক্রম শুরু না হাওয়ায় হতাশ কুষ্টিয়াবাসী। আদৌ এ প্রকল্প আলোর মুখ দেখবেকি না তা নিয়ে রয়েছে শংসয়।

জানা গেছে, গত ২০১২সালের ১৮ এপিল শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মুন্নজান সুফিয়ান এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। ঘোষণার পর আশায় বুক বাধে মানুষ।

কিন্তু দীর্ঘ ৩ বছর অতিবাহিত হলেও কুষ্টিয়াবাসীর কাঙ্খিত স্বপ্ন পুরণ না হাওয়ায় মানুষের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির রাজধানী হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বৃদ্ধ কুষ্টিয়ার উত্তর পশ্চিম এবং উত্তরে পদ্মা নদীর অপর তীরে রাজশাহী, নাটোর ও পাবনা জেলা, দক্ষিণে ঝিনাইদহ জেলা, পশ্চিমে মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলা এবং পূর্বে রাজবাড়ী জেলা অবস্থিত।

পাশ্ববর্তী ভারতের সাথে কুষ্টিয়ার ৪৬.৬৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা রয়েছে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত কুষ্টিয়ায় শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বাংলাদেশকে করেছে সমৃদ্ধ।

এছাড়াও বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন এবং বাউল সম্রাট লালনের তীর্থভূমি, পুরাতন কুষ্টিয়া হাটশ হরিপুর গ্রামে গীতিকার, সুরকার ও কবি আজিজুর রহমানের বাস্তভিটা ও সমাধীস্থল।

এ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছেন বিশিষ্ট কবি দাদ আলী, লেখিকা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’ গানের রচয়িতা আবু জাফর, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান, কুষ্টিয়ার সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা কাঙাল হরিণাথ, নীল বিদ্রোহের নেত্রী প্যারী সুন্দরী, স্বদেশী আন্দোলনের নেতা বাঘা যতিন, প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী, সঙ্গীত শিল্পী মোঃ আব্দুল জববার, ফরিদা পারভীনসহ অসংখ্য গুণীজনের পীঠস্থান কুষ্টিয়া জেলাকে সমৃদ্ধ করেছেন।

কুষ্টিয়ার পটভূমি সম্পর্কে জানা গেছে, কুষ্টিয়ার নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী। তবে এক সময় কোষ্টার (পাট) চাষ হত বলে কোষ্টা শব্দ থেকে কুষ্টিয়া নামকরণ হয়েছে।

হেমিলটনের গেজেটিয়ারে উল্লেখ আছে যে স্থানীয় জনগণ একে কুষ্টি বলে ডাকত যে কারনে এর নাম করণ হয়েছে কুষ্টিয়া। অনেকের মতে ফরাসি শব্দ ’কুশতহ’ যার অর্থ ছাই দ্বীপ থেকে কুষ্টিয়ার নামকরণ হয়েছে।

সম্রাট শাহজাহানের সময় কুষ্টি বন্দরকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়া শহরের উৎপত্তি ঘটেছে। ১৭২৫ সালে কুষ্টিয়া নাটোর জমিদারীর অধীনে ছিল এবং এর পরিচিতি আসে কান্ডানগর পরগণার রাজশাহী ফৌজদারীর সিভিল প্রশাসনের অন্তর্ভুক্তিতে।

পরে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ১৭৭৬ সালে কুষ্টিয়াকে যশোর জেলার অন্তর্ভূক্ত করে। কিন্তু ১৮২৮ সালে এটি পাবনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৮৬১ সালে নীল বিদ্রোহের কারণে কুষ্টিয়া মহকুমা প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ১৮৭১ সালে কুমারখালী ও খোকসা থানা নিয়ে কুষ্টিয়া মহকুমা নদীয়ার অন্তর্গত হয়। ভারত উপমহাদেশ বিভক্তির পূর্বে কুষ্টিয়া নদীয়া জেলার আওতায় একটি মহকুমা ছিল।

১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া জেলার অভ্যুদয় ঘটে। তখন কুষ্টিয়া জেলা ৩টি মহকুমা নিয়ে গঠিত ছিল। এগুলো কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা এবং মেহেরপুর।

এরপর ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর আলাদা জেলা হিসেবে পৃথক হয়ে গেলে কুষ্টিয়া মহকুমার ৬টি থানা নিয়ে বর্তমান কুষ্টিয়া জেলা গঠিত হয়।

১৬২১.১৫ বর্গ কিলমিটারের আয়তন বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেলা বর্তমানে ৬টি উপজেলার এবং ১টি থানা নিয়ে গঠিত। ১১,৭১,৪২৭ ভোটার সংখ্যার মধ্যে রয়েছে ৫,৭২, ৯৬৩ জন পুরুষ এবং ৫,৯৮,৪৬৪ জন মহিলা।

ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্বৃদ্ধ কুষ্টিয়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতকরণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ তিন বছর ধরে ঝুলে আছে।

বর্তমান মহাজোট সরকার দুই মেয়াদে সরকার গঠনের পরেও কুষ্টিয়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত না করায় জনমনে হতাশা দেখা দিয়েছে।

এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নজরুল ইসলাম মুকুল বলেন, দেশের অনেক বিভাগীয় শহর থেকেও কুষ্টিয়া নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

ভৌগলিক গুরুত্ব বিবেচনা করে কুষ্টিয়া পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীতকরা আগেই দরকার ছিল। কারণ সিটি কর্পোরেশন কুষ্টিয়া বাসীর প্রানের দাবি।

এমকে