রামপালে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গতকাল শুক্রবার আয়োজিত সাইকেল শোভাযাত্রায় বাধা দিয়েছেন ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী। পরে শোভাযাত্রা বের হলে জলকামান নিয়ে তাদের ধাওয়া করে পুলিশ। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতার হাত ভেঙে যায়। শাহবাগ ও তেজগাঁও থানায় অন্তত ১৩ জনকে আটক করার পর ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিভিন্ন ছাত্র-যুব ও রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠন এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, শহীদ মিনারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের রামপালের পক্ষে একটি মানববন্ধন ছিল। সেখানে অন্য কেউ কোনো কর্মসূচি পালন করেছে কি না, বা কেউ বাধা দিয়েছে কি না, তা জানি না।’

শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘সুন্দরবন বাঁচাও সাইকেল মিছিল’ নামে ফেসবুকের একটি ইভেন্টে সাড়া দিয়ে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে সাইকেল নিয়ে শহীদ মিনারে হাজির হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আসার পথে নিউমার্কেট, প্রেসক্লাব ও ফার্মগেটে অনেককে আটকে দেয় পুলিশ।

তাঁদের শহীদ মিনারের দিকে যেতে নিষেধ করে দেওয়া হয়। ১১ জন সাইকেল আরোহীকে তেজগাঁও থানায় আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

শহীদ মিনারে কর্মসূচি উদ্বোধন করার জন্য হাজির হন তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। এর কিছুক্ষণ পরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানার নিয়ে ছাত্রলীগের শতাধিক নেতা-কর্মী সেখানে উপস্থিত হন। তাঁরা শহীদ মিনারের চারপাশ ঘিরে মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে পড়েন। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই’।

শহীদ মিনারে ওই মানববন্ধনে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি রুম্মন হোসেন, প্রচার সম্পাদক মো. মনজুরুল ইসলাম, সমাজসেবা সম্পাদক দীপু চন্দ্র রায়সহ অনেককে দেখা গেছে। এ ছাড়া হল পর্যায়ের নেতাদের মধ্যে জগন্নাথ হলের শান্ত ধর, ফজলুল হক হলের শাওন, এফ রহমান হলের হাফিজ, শাহরিয়ার প্রমুখ নিজেদের কর্মীদের নিয়ে মানববন্ধনে যোগ দেন।

এ সম্পর্কে আবিদ আল হাসান বলেন, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। সেখানে যদি ছাত্রলীগের কেউ উপস্থিত থাকেনও, তবে তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে ছিলেন। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কেউ যেকোনো বিষয়ের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নিতেই পারেন।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষের মানববন্ধনকারীরা শহীদ মিনারকে একপ্রকার অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধীরা শহীদ মিনারে গান, কবিতা ও স্লোগানের মাধ্যমে ওই প্রকল্প বাতিলের দাবি জানাতে থাকেন। এ সময় পুলিশের অনেক সদস্য আশপাশে অবস্থান নিলেও তাঁরা কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিলেন।

শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, এখানে দুই পক্ষই অনুমতি ছাড়া নিজ নিজ দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। তবু পুলিশের পক্ষ থেকে কাউকে বাধা দেওয়া হয়নি।

শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি তুহিন কান্তি দাস বলেন, মানববন্ধনের নাম করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের বাধা দিচ্ছিলেন। শহীদ মিনারে কাউকে যেতে বা সেখান থেকে আসতে দিচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হাসিব মোহাম্মদ আশিকের হাত ভেঙে যায়।

সাইকেল শোভাযাত্রাটি শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে মোহাম্মদপুর, সংসদ ভবন, ফার্মগেট, শাহবাগ হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে অন্তত পাঁচবার সাইকেল মিছিলটি শহীদ মিনার থেকে বের হতে চাইলেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের বাধার কারণে বের হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত বেলা একটার দিকে শোভাযাত্রা শুরু হয়ে দোয়েল চত্বর পার হওয়ার সময় পেছন থেকে জলকামান নিয়ে ধাওয়া করে পুলিশ। তারা মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দোয়েল চত্বরের সামনে থেকে দুজনকে আটক করা হয়।

ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে আয়োজিত এ ইভেন্টের সমন্বয়ক সামান্তা শারমিন দাবি করেন, ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় অর্ধশতাধিক অংশগ্রহণকারী আহত হয়েছেন।

শাহবাগ, ধানমন্ডি, নীলক্ষেত, পলাশীসহ বিভিন্ন স্থানে সাইকেল মিছিলে আসা ব্যক্তিদের পুলিশ আটকে দেয়। ঢাকা কলেজের সামনে দিয়ে মিছিলে আসার সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা একজনকে প্রহার করেন এবং তাঁর সাইকেল ভেঙে দেন। শহীদ মিনার থেকেও কয়েকজনের সাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা
তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ও সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, ‘সাইকেল র‌্যালির মাধ্যমে সুন্দরবন রক্ষার পক্ষে তরুণদের মত প্রকাশের এই কর্মসূচির ওপর ছাত্রলীগের সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশের সন্ত্রাসী হামলায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে আহূত এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে এ রকম ন্যক্কারজনক হামলার মাধ্যমে সরকার নিজেদের নৈতিকভাবে এবং যুক্তিতে পরাজিত হিসেবে প্রমাণ করল।’

এ ছাড়া ঘটনার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

এম এ