রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিষয়ে জাতিসংঘের করা তদন্ত প্রতিবেদন মিয়ানমার প্রত্যাখ্যান করলেও কিছু যায় আসে না, কারণ এটি এরই মধ্যে সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম।

আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। আগামীকাল থেকে নেপালে শুরু হতে যাওয়া বিমসটেক সম্মেলন নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মিয়ানমারের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যার’ অভিযোগ এনে গত সোমবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে, শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর সুপারিশ করা হয়।

এরপর মঙ্গলবার মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যানের কথা জানানো হয়। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের মুখপাত্র জ হতয়ে বলেন, ‘আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, মানবাধিকার কাউন্সিল পরিচালিত কোনো সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।’

মিয়ানমারে জাতিসংঘের কোনো তদন্তকারীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি উল্লেখ করে জ হতয়ে বলেন, ‘এ জন্যই আমরা মানবাধিকার কাউন্সিলের কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নই।’

আজকের সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘এটা খুবই ন্যাচারাল যে মিয়ানমার এই রিপোর্টটি প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। এটা তাদের অবস্থান থেকে তারা এটা করবে। কিন্তু বিশ্বসভায় এটা সুপ্রতিষ্ঠিত। তারা যতই বলুক বা প্রোপাগাণ্ডা করুক।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে অপর এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ খুবই ধৈর্যের সঙ্গে তাদের সঙ্গে এনগেইজড আছে। আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, প্রত্যাবাসনটাও জরুরি। বাংলাদেশ সেটা চায় খুব দ্রুততার সঙ্গে। কিন্তু একটি বিষয়ে আমরা সাবধান সেটি হচ্ছে, আমরা নিশ্চিত করতে চাই, এই প্রত্যাবাসন যেন টেকসই হয়।’ 

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নির্বিচার হত্যা, গণধর্ষণ, শিশু নির্যাতন ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া—এসব ঘটনাকে সামরিক অভিযান পরিচালনার কথা বলে কোনোভাবেই ন্যায্যতা দেওয়া যাবে না।’

গত বছরের মার্চে মিয়ানমারে, বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের জন্য জাতিসংঘ ইনডিপেনডেন্ট ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গঠন করে।

গত বছরের ২৪ আগস্টে কয়েকটি পুলিশ চেকপোস্টে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা হামলা চালায়। এর পরের দিন থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। এ সহিংস অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন সময় সহিংসতার শিকার আরো চার লাখ রোহিঙ্গা তার আগে থেকেই বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থান করছে।

প্রতিবেদনে জাতিসংঘ উল্লেখ করে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে দশকের পর দশক বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতে আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার তারা।

তদন্ত পরিচালনার জন্য মিয়ানমার সরকার দেশটিতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের প্রবেশ করতে না দিলেও প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট চিত্র, অন্যান্য ছবি ও ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়।

আন্তর্জাতিক বেসরকারি চিকিৎসা সংস্থা ‘এমএসএফ’-এর মতে, গত বছরের আগস্টে রাখাইনে সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতার প্রথম মাসেই অন্তত ছয় হাজার ৭০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৭৩০ শিশুও ছিল।

এমআর