নগরীর বিভিন্ন স্কুল-কলেজে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা নিয়ে আন্দোলন করে খ্যাতির চূড়ায় উঠেন মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি।

গেল শনিবার নগরীর চকবাজার এলাকার বেসরকারি বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খানকে মারধর করে তুমুল সমালোচনা ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

এই কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা নিয়ে সেদিন অধ্যক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন রনি। অধ্যক্ষকে মারধরের বিষয়টি কলেজের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আর এই ফুটেজ রনির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো! ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায় ফুটেজটি।

ফেসবুকের মাধ্যমে এ ঘটনা চট্টগ্রাম তো বটেই, সারাদেশে ভাইরাল হয়ে পড়ে। বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে সরকার এবং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

যদিও এই ফুটেজ ফেসবুকে আসার আগে অধ্যক্ষকে মারধর করার বিষয়টি দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন রনি। ফুটেজ দেখে রনি মিডিয়ার কাছে দাবি করলেন, তখন সেন্স ঠিক রাখতে পারেননি।

চারদিন পর বুধবার রাতে এ ঘটনায় সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে চকবাজার থানায় মামলা দায়ের করেন বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহেদ খান। এতে রনিসহ আরও ৬ ছাত্রলীগ কর্মীকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে রনির বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়।

মামলার পর অধ্যক্ষ জাহেদ খান রনির গোমর ফাঁস করে দিলেন! দুই মাস আগে তাঁর সাথে রনির মোবাইল ফোনে কথোপকথনের দুটি অডিও রেকর্ড গতকাল বিকেলে ফাঁস করে দেন তিনি। এই অডিও রেকর্ড থেকে মোটামুটি প্রমাণিত হওয়া যায় তাকে চাঁদা না দেওয়ার কারণে মূলত অধ্যক্ষের ওপর এই আক্রমণ।

রনির এমন কাণ্ডে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সংসদ তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বলে গতরাতে ফোনে জানিয়েছেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ। তিনি বলেন, ‘রনির বিরুদ্ধে অসাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের কিছু তথ্য আমাদের কাছে এসেছে। আমরা খুব দ্রুত একটা সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছি।’

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ‘রনিকে পুলিশ যদি গ্রেফতার করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার আগে তাঁকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।’

চকবাজার থানার ওসি তদন্ত আরিফ হোসেন বলেন, ‘আসামিকে গ্রেফতার না করতে আমাদের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। যে যতটুকু কর্ম করবে ততটুকু ফল তো পাবেই।’ জাহেদ খানের সঙ্গে রনির দুটি অডিও রেকর্ডে কী আছে?

অধ্যক্ষ জাহেদ খানের সঙ্গে নুরুল আজিম রনির মোবাইলে কথা বলার একটি অডিও রেকর্ড ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আরও একটি অডিও রেকর্ড গতকাল বিকেলে ফাঁস হয়। রেকর্ডে শুনা যায়, জাহেদ খানের সাথে রনি কথা বলার সময় চলিত ভাষার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও ব্যবহার করেন।

২১ সেকেন্ডর একটি অডিও রেকর্ডে রনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জাহেদ খানকে বলেন, ‘তুঁই ক্যানে .. (প্রকাশযোগ্য নয়) শান্তিত থাহো আঁই চাইয়্যুম, আঁই অশান্তিত থাইক্কুম তো, আঁই কেউরে শান্তিত থাইকতে ন দিইয়্যুম। তোঁয়ার তুনো বরো মাইনস্যারে শান্তি ন দিইর আঁই। আঁই কিছু পারি ন পারি অশান্তি হরি দিই (তুমি কেমনে শান্তিতে থাকো, আমি দেখবো, আমি অশান্তিতে থাকবো তো, আমি কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবো না। তোমার চেয়ে বড় মানুষদের আমি শান্তি দিই না। আমি কিছু পারি আর না পারি, অশান্তি করে দিই)। জাহেদ সাব … (প্রকাশযোগ্য নয়) দুই মাসে দেখা গরিত নঁ পারো (দুই মাসে দেখা করতে পারেন নাই)।

৪ মিনিট ২৩ সেকেন্ডের আরেকটি অডিও রেকর্ডে রনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জাহেদ খানকে বলেন, ‘ধানমণ্ডিতে জায়গা কিনছেন, বিল্ডিং করছেন…ভুয়া ডিগ্রি একটা আমেরিকা থেকে আনছেন.. আঁই প্রকাশ গইল্যে (আমি প্রকাশ করলে) অসুবিধা নাই তো? তখন এ প্রান্ত থেকে জাহেদ খান রনিকে বলেন, ‘আমি প্রাইভেট মানুষ। আমার ডিগ্রি ১০০টা ভুয়া হলে অসুবিধা নাই। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেছি। আমার ডিগ্রি ভুয়া না কি তখন দেখবো।’ এরপর রনি বলেন, ‘ঠিক আছে, ওয়েট অ্যান্ড সি, হালিয়ে পেপারত দিইয়্যুম (আগামীকাল পত্রিকায় দিয়ে দেবো), বিজ্ঞাপন আকারে।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে রনি বলেন, ‘আঁই অনেরে হইলাম দে, আঁই অনের লয় ব্যক্তিগত সমস্যাত যাইতাম না চাই (আমি আপনাকে বললাম যে, আমি আপনার সাথে ব্যক্তিগত সমস্যায় জড়াতে চাই না)। এতাল্লাই বলি অনের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড লইনেও প্রশ্ন ন গরির..অনে ইয়েন সমঝোতা গইয্যন দে নইনে এদিইন্যে (এজন্য আপনার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না)… ইয়া আবার ফেসবুকত এগিন কি দিয়্যুন দে (এখন আবার ফেসুবকে এসব কি দিয়েছেন)।

এসময় জাহেদ খান ফোনের এ প্রান্ত থেকে বলেন, ‘যারা টাকা পয়সা দিতে চায় তাদের আমরা ওভাবে সেটেল…। তখন অপর প্রান্ত থেকে রনি বলেন, ‘যারা টাকা পয়সার দিকে যেতে চায়, তারা তো যাবে, আসবে। যারা যেতে চায় না তারা নিবে না। আর আপনি কোনো স্টুডেন্টদের হাতে টাকা দিবেন না। টাকা দিবেন অভিভাবকদের হাতে। মাঝখানে এসব আবার কি ঢুকাইলেন? আমি কিন্তু আজকেও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করেছি। দেখেন, আমি কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানের বারোটাই বাজামু। নিয়ম লাগবে না, মন্ত্রণালয়ের নিয়ম লাইগদো ন্য (লাগবে না), বয় তাইক্যুম নে নিছদি ঢুইকতে পাইত্তোনি কেউ (নিচে বসে থাকবো, কেউ ঢুকতে পারবে না) …।’ এসময় অপর প্রান্ত থেকে জাহেদ খান বলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন যে ওইটা ভালো হবে তাহলে ওটা করে দিবো।’

এই ফোনালাপে রনির সাথে যখন জাহেদ খান ফোনে এসব কথা বলেন তখন তিনি ঢাকায় ছিলেন বলে জানা যায়। ফোনে কথোপকথনের একপর্যায়ে রনি জাহেদ খানকে বলেন ‘আপনি কলেজে আসবেন কবে?’ অপর প্রান্ত থেকে তখন জাহেদ খান বলেন, ‘আমি ঢাকায়।‘ তখন রনি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আসবেন কবে ? দেখা করা বেশি ইমপর্টেন্ট।’ এসময় জাহেদ খান বলেন, ‘আমি আসলে আপনাকে ফোন দেবো।’

সূত্র: সুপ্রভাত

মাসুম/জেড