ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে খুনোখুনি অব্যাহত রয়েছে। একেক ধাপের নির্বাচন শেষ হয় আর বাড়তে থাকে লাশের সংখ্যা। প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচন শেষ হয়েছে ৩৭টি লাশ দিয়ে। এবার তৃতীয় দফা নির্বাচন শেষে লাশের সংখ্যা দাঁড়াল ৪৩-এ।
গতকালও দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতায় বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। তৃতীয় দফার নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতায় মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়নের বাগবাড়িয়া গ্রামে গতকালও (সোমবার) সহিংসতায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গত সপ্তাহে সোমবার ভেড়ামারায় এক সাবেক প্রধান শিক, গাজীপুরের শ্রীপুর এবং মাগুরার শ্রীপুরে মোট তিনজন নিহত হয়েছেন। নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতার জেরে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আপন দুই ভাইকে গত রোববার রাতে নির্দয়ভাবে কোপায় দুর্বৃত্তরা। এরমধ্যে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন বড় ভাই ফকিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মজিবর রহমান (৬৮)। ছোট ভাই মিজানুর রহমানের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তারা দু’জনই বিএনপির সমর্থক বলে জানা গেছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরে ৪২ ঘণ্টার ব্যবধানে ফের এক ব্যক্তি নিহত ও ৯ জন আহত হয়েছেন। সোমবার সকালে গোসিংগা বাজার বটতলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত বিজয়ী চেয়ারম্যান শাহজাহান সরকারের সমর্থকদের সাথে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারামারির ঘটনা ঘটে। এ সময় গুরুতর আহত হযরত আলী সরদার (৫৫) হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। এর আগে রোববার রাতে শাহজাহান সরকারের সমর্থক এফ এম আবদুল্লাহর (৪২) ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ দিকে রোববার বিকেলে বরমী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে দুই মেম্বার প্রার্থী শামীম আহম্মেদ ও মারুফ শেখের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে জমির (৩৪), করিম (২৮), রফিক (২৫), নিজাম উদ্দিন (৫৫), সাকিব (২৫) ও রহিম (২৮) গুরুতর আহত হন। প্রতিপরে হামলায় জমিরের ডান হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রোববার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ী এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার প্রার্থী শফিক উদ্দিনের সমর্থক কলিম উদ্দিন মোড়লকে (৪২) নুরুল হক মোড়লের সমর্থকেরা পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন।
এ দিকে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়নের চরজোকা গ্রামে নির্বাচনপরবর্তী সহিংসতায় একজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন।
শ্রীপুর থানার ওসি রেজাউল ইসলাম বলেছেন, গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনী বিরোধ নিয়ে শ্রীপুর উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়নের বিজয়ী আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবদুল হালিম ও পরাজিত আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী ইউসুফ মণ্ডলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে গতকাল সোমবার সকালে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আবদুল হালিম চেয়ারম্যানের সমর্থক ও আওয়ামী লীগ কর্মী বাবলু মিয়া শেখ (৩৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় সংঘর্ষে উভয় পরে অন্তত ২০ জন আহত হন।
রংপুরের মিঠাপুকুরে ইউপি নির্বাচনে দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আবদুল হান্নান (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপে দুইজন। গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান হান্নান।
তৃতীয় দফা নির্বাচনের পরদিন সংঘর্ষে দুইজন নিহত হয়েছেন। তাদের একজন টাঙ্গাইলের নাগরপুরের মো: নুরুল হুদা (৪৭) ও কিশোরগঞ্জের ভৈরবের ছিদ্দু মিয়া (৬০)। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনপরবর্তী, প্রাক নির্বাচনী সংঘর্ষে ৪৬৩ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অগ্নিসংযোগ, বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামের মো: গোলাম মোস্তফার ছেলে নুরুল হুদা গত মঙ্গলবার রাতে তেবাড়িয়া বাজার থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে আশা ব্যাংকের সামনে পৌঁছলে একদল সন্ত্রাসী তাকে কুপিয়ে আহত করে। তাকে এনাম মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শনিবার দুপুরে মারা গেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে নিহত মো: নুরুল হুদা আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আজহারুল ইসলাম মন্টুর সমর্থক। সেই আক্রোশে তার ওপর হামলা চালান হয়।
ভৈরবের শ্রীনগর ইউনিয়নে নির্বাচনে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার রাতে ইউপি সদস্য প্রার্থী আবুল বাসার ও সেলিম মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরই জেরে পরদিন শুক্রবার বিকেলে ফের সংঘর্ষে প্রতিপরে হামলায় আবুবকর ছিদ্দিক ওরফে ছিদ্দু মিয়াসহ (৬০) আরো ২০ জন গুরুতরভাবে আহত হন। পরে আহত ছিদ্দু মিয়াকে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত শনিবার রাত সাড়ে ৮টায় তিনি মারা যান। নিহত ছিদ্দু মিয়া ইউপি সদস্য প্রার্থী সেলিম মিয়ার সমর্থক ছিলেন।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় দফার নির্বাচন শেষ হয়েছে ৩৭টি লাশ দিয়ে। এরমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতের ঘটনাও রয়েছে। এ দিকে সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিক আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকার নবাবগঞ্জের এক চেয়ারম্যান প্রার্থী গতকাল বলেছেন, এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কের মধ্যে আছে। আগামী ৭ মে তার ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মাসুম নামের এক সাংবাদিক বলেন, নির্বাচনী খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়। তিনি বলেন, তৃতীয় দফার নির্বাচনে তিনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং গিয়েছিলেন সংবাদ সংগ্রহের জন্য। সেখানে থানার ওসি সাংবাদিকদের সাথে যে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন তাতে দুর্বৃত্তরা তো বেপরোয়া হয়ে উঠবেই। কাশিয়ানীতে দুর্বৃত্তদের হাতে আহত সাংবাদিক হাবিব পঞ্চায়েত বলেন, এভাবে তাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটবে তা ভাবতেও পারেননি।
এ দিকে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এভাবে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, তারা সহিংসতা রোধে চেষ্টা করছেন। কিন্তু এরপরেও কিছু ঘটনা ঘটছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রথম দফা থেকে গতকাল পর্যন্ত ছোট-বড় সাত শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে। সূত্র-নয়া দিগন্ত।
এমবি





