এক মাসের ব্যবধানে পিয়াঁজের দাম বেড়েছে ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পিয়াঁজের দাম ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ১ সপ্তাহ আগে যা ছিল ৬০-৬৫ টাকা। ১ মাস আগে এ দাম ছিল ৩৫-৪৫ টাকা।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি এবং ভারতের বাজার থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে বলে জানা গেছে।
আর সরবরাহ বাড়াতে বিকল্প উৎস থেকে পিয়াঁজ আমদানি শুরু হলেও এখনো তার প্রভাব পড়েনি বাজারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মূল্য বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা না গেলে কোরবানি ঈদের আগে ১০০ টাকা পর্যন্ত দাম উঠতে পারে মসলা জাতীয় এ পণ্যটির।
তবে শ্যামবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পেঁয়াজের দাম কমবে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগের ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)এর মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ এসেছে, এখন আসছে পাকিস্তান থেকে। চীন থেকেও এসেছে কিছু পেঁয়াজ, আরও আমদানির উদ্যোগ চলছে, এসব কারণে দেশের পাইকারি বাজারে পেঁয়াজের দাম কমতে যাচ্ছে।
ঢাকায় পেঁয়াজের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে বুধবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয় ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। সোমবার এই পেঁয়াজের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা। এই বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে তা মিলছে ৫৫ টাকার মধ্যে। সোমবার এর দাম ছিল ৭০ টাকা।পাইকারি বাজারে কেজিতে ১৫ টাকা কমলেও খুচরা বাজারে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই।
আসন্ন কোরবানির ঈদে পিয়াঁজের দাম আরও বেড়ে যাবে, এমন আশঙ্কায় বিকল্প উৎস থেকে পণ্যটি আমদানি করতে এলসি খোলেন ব্যবসায়ীরা। প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তান, মিসর, মায়ানমার ও চীন থেকে পিয়াঁজ আমদানি শুরু হলেও দাম না কমে বাড়তি দামেই তা বাজারে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে পিয়াঁজ উৎপাদন হয়েছে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টন। গত অর্থবছরে দেশে পিয়াঁজ আমদানির পরিমাণও বেড়েছে।
২০১২-১৩ অর্থবছরে পিয়াঁজ আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৫২ হাজার টন, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৩১২ টন।
পরিসংখ্যান বলছে, গেল ছয় মাসে দেশে ৩ লাখ ৬০ হাজার টন পিয়াঁজ আমদানি হয়েছে। পর্যাপ্ত মজুদ দেশে এই মুহূর্তে পিয়াঁজের কোন সংকট নেই। অতিবৃষ্টির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ভারত সরকার ইতোমধ্যে পিয়াঁজের রপ্তানি মূল্য দ্বিগুণ(৭০০ ডলার)করেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে ভারতে পিয়াঁজের নূ্ন্যতম রপ্তানি মূল্য টনপ্রতি ১,১৫০ ডলার নির্ধারণের পর দেশের খুচরা বাজারে প্রতিকেজি পিয়াঁজ ১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। তবে সংকট মেটাতে তখন ভারতের বদলে মায়ানমার, পাকিস্তান ও চীন থেকে পিয়াঁজ আমদানি শুরু করায় দাম কমে গিয়েছিল। এর কিছুদিন পরই ভারত রপ্তানি মূল্য এক লাফে কমিয়ে ১৫০ ডলারে নির্ধারণ করেছিল।
শ্যামবাজারের আড়ৎদার রতন সাহা টাইমনিউজকে বলেন, ‘বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ভালো। কিন্তু ভারতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল। এখন চাহিদা একটু কমে আসায় এবং বিভিন্ন দেশ থেকে পিয়াঁজ আমদানি হওয়ায় দাম কমতে শুরু করেছে।’
এদিকে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে খোলাবাজারে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করবে টিসিবি। এর সঙ্গে বিক্রি হবে ভোজ্যতেল ও চিনি। টিসিবির চেয়ারম্যান টাইমনিউজকে বলেন, কোরবানির ঈদের আগ পর্যন্ত খোলাবাজারে এই বিক্রির কার্যক্রম চলবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতে সম্প্রতি পিয়াঁজের দাম বেড়ে দুই বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছেছে। শিলা বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়াতে ভারতের পিয়াঁজ উৎপাদনকারী রাজ্যগুলো থেকে সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাজারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারত সরকার পিয়াঁজ আমদানির ঘোষণা দিলেও তাতে দাম কমছে না।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত দু'দিনে আবার লাগামহীন বেড়ে চলছে পিয়াঁজের দাম। দাম বৃদ্ধির এই কারসাজির মূলে রয়েছে ব্যবসায়ীরা। কোরবানি ঈদের আগে অতি মুনাফা হাতিয়ে নেয়াই তাদের লক্ষ্য। দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত বাজার মনিটরিং টিম, গোয়েন্দা সংস্থা এবং দ্রব্যমূল্য সংক্রান্ত পূর্বাভাস সেল বাজার পর্যবেক্ষণ করে দেখেছে দেশে পিয়াঁজের কোন ঘাটতি নেই। মজুদ এবং আমদানি পরিস্থিতি যে অবস্থায় রয়েছে তাতে দাম বাড়ার কোন কারণ নেই।
এ বিষয়ে কাওরান বাজার পাইকারি বাজারের আড়ৎদার নিতাই রঞ্জন বলেন, ভারতে নাসিক জাতের পিয়াঁজের মৌসুম প্রায় শেষ, তার উপর ভারী বর্ষণে পিয়াঁজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বাজারে পিয়াঁজ সংকট বেড়েছে। এর বাইরে আছে আমদানি মূল্য বৃদ্ধি। বেলুয়ারি জাতের নতুন পিয়াঁজ বাজারে উঠেনি। এসব কারণে আমদানিকারকরা পিয়াঁজের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন টাইমনিউজকে বলেন,সরকারের উদ্যোগের ফলে মায়ানমার থেকে পিয়াঁজ আসা শুরু হয়েছে। উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত না হলে ভারতের বাজারও চালু হবে। এছাড়া বিকল্প বাজার হিসেবে আরও কয়েকটি দেশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। নিজস্ব মজুদ ভালো অবস্থায় আছে। তাই আপাতত পিয়াঁজ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে আগামী কোরবানির ঈদে পিয়াঁজের দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মামুন বলেন, পিয়াঁজের দাম নিয়ে কারসাজি ও চক্রান্ত করা হলে তাদেরকে ছাড় দেয়া হবে না। তবে সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজনে আমদানি প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে।
যদি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে দাম স্বাভাবিক না হয়ে আসে, তাহলে এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে কোন অবস্থাতে পিয়াঁজের বাজার অস্থিরতার কারসাজিকে প্রশ্রয় দেবে না সরকার।
এএইচ





