বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘূর্ণিঝড় প্রবণ দেশ। বঙ্গোপসাগর ও উপকূলবর্তী মানুষ একদিকে যেমন এই দুর্যোগের সাথে লড়াই করে টিকে আছে , তেমনি তাদের অসহায়ত্বও আছে। তাই দুর্যোগ মোকাবেলায় স্থায়িত্বশীল ও স্থানীয় সক্ষমতা প্র‍য়োজন বলে মনে করেন দুর্যোগ কবলিত উপকূলবাসীর পক্ষে কাজ করা সংগঠন কোস্ট ট্রাস্ট।

বুধবার (৮মে) জাতীয় প্রেসক্লাবে দুর্যোগের পূর্বে অতি প্রস্তুতি ও দুর্যোগের পর সব ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসুন লক্ষ্যে 'দুর্যোগ মোকাবেলায় চাই স্থায়িত্বশীল ও স্থানীয় সক্ষমতা' ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।

দুর্যোগ কবলিত উপকূলবাসীর পক্ষে, কোস্ট ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন, দুর্যোগ ফোরাম ও দুর্যোগ গবেষণা বিশ্লেষক নাইম গোহর ওয়ারী, কৃষক ফেডারেশন সভাপতি এ এস এম বদরুল আলম, বি এন এস সে প্রধান নির্বাহী এ এস এম বজলির রহমানসহ প্রমুখ।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ মােকাবেলায় যথেষ্ট তৎপর ভূমিকা পালন করেছে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন যথাসাধ্য কর্মতৎপরতা দেখিয়েছে। সরকারী ও বেসরকারী এই উদ্যোগসমূহকে কার্যকর ও স্থায়িত্বশীল করার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে।

তারা এই বিষয়ে কিছু পরামর্শ ও উদ্যোগের কথা জানান। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:


যে কোনাে দূর্যোগে ৩টি পর্যায় থাকে

দুর্যোগপূর্ব , দুর্যোগকালীন এবং দুর্যোগ পরবর্তী পর্যায় এবং সে অনুযায়ী বিশ্ব পক্ষের ( রাষ্ট্রিয় , গণমাধ্যম , প্রাইভেট সেক্টর , এনজিও ) আলাদা করণীয় থাকে। প্রায়ই দেখা যায় , দূর্যোপের পূর্বে অতি প্রস্তুতির ঘটনা ঘটে যা বাস্তবভিত্তিক নয় , দুর্যোগের সময় দেখা দেয় সময়ের অভাব, আবার দুর্যোগের পরদিনই তা সকলের মধ্যে হারিয়ে ফেলে। তখন অতি প্রয়ােজনীয় বিষয়টিও অবহেলার শিকার হয় ।


দুর্যোগ ফণী বাংলাদেশে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক প্রভাব বা প্রাণহানী না ঘটালেও , জাতীয় প্রতিষ্ঠানসহ ঘুনীঝড় মোকাবেলা ব্যবস্থায় আমাদের ব্যাপক সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে , যা কোনােভাবেই আর অবহেলা কার সুযােগ নেই । এর মধ্যে আমরা যেসব বিষয় প্রত্যক্ষ করেছি তা হচ্ছে,

গড়পড়তা বিপদসংকেত : ঘুণিঝড়ের গতি প্রকৃতি , স্থলভাগে আঘাত হানার সময় ও সাম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ইত্যাদি । সঠিকভাবে চিহ্নিত করে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ অনুযায়ী স্থান ভেদে আলাদা পদক্ষেপ না নিয়ে সকল স্থানে গড়পড়তা বিপদসংকেত জারি করা হয় ।

উপর , এ সংক্রান্ত তথ্য জানতে আগ্রহীরা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুক্রবার রাত পর্যন্ত আবহাওয়া অফিসের ওয়েব সাইটে ( www . bmd . gov . bd ) ঢুকতে পারেননি সম্ভবত স্বল্প ব্যান্ডউইডথ থাকার কারণে ।

মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেবার পরিকল্পনাঃ ঘূণিঝড় ফণীর গতিপথ থেকে বহু দূরে অবস্থান করা সত্ত্বেও কক্সবাজারে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে জোর করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া , ঝড়ের ৪ - ৫ দিন আগে থেকেই সকল নৌ - চলাচল বন্ধ করে রাখার ঘটনা ঘটেছে । আবার নাজুক অবস্থানে থাকার পরও ভােলার ঢালচরের মতাে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে তেমন কোনাে ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি ।

তথ্যের গড়মিলঃ ঘুর্ণিঝড় ফণী বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যের মধ্যে বেশ গড়মিল ছিল । যার সুযােগে সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যমে অসমর্থিত ও বানােয়াট সতর্কতা সংকেত ছড়িয়ে পড়ে ও জনমনে বিভ্রান্তি ও ভীতির সঞ্চার হয় ।

সংকেত উঠে যাবার সাথে সাথে বিপদ ভুলে যাওয়াঃ ৪ মে রাতের পর আকাশ পরিষ্কার হওয়া মাত্র প্রশাসন , জাতীয় ও গণমাধ্যমসহ প্রায় সকলেই এই ঘূণিঝড় সম্পর্কে বিস্মৃত হন । অথচ সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে ভােলা পর্যন্ত বেশ কয়েক জায়গায় অতি জোয়ারের প্লাবন , সহস্রাধিক ঘড়বাড়ি বিধ্বস্ত হওয়া সয়েও সেগুলাে আর মনােযােগ পাচ্ছে না । হঠাৎ সিদ্ধান্ত নদীপথে বা নদী বন্দরে আলাদা করে পূর্ব সতর্কতা জারি না করে হঠাৎ করে শেষ মুহূর্তে ফেরিঘাট বন্ধ করে দেয়ায় দুইপাড়ে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে এবং হাজার হাজার মানুষ দুর্ভোগে পড়ে।

সাংবাদিক সম্মেলনে তারা আরও বলেন, আমরা মনে করি , স্থায়িত্বশীল ঘুর্ণিঝড় মােকাবেলা সক্ষমতা গড়ে তােলার জন্য নিম্নোক্ত বিষয়গুলােতে জরুরি ভিত্তিতে মনােযােগ দেয়া প্রয়ােজন।

১ । আবহাওয়ার পূর্বাভাস ক্রমাগত আপডেট ও সুনির্দিষ্টকরণ করাঃ অতিসতর্কতা , গড়পড়তা ও গৎবাঁধা বক্তব্য যথাসম্ভব পরিহার করে সুনির্দিষ্ট করতে হবে । বর্তমানের প্রযুক্তির বিকাশের যুগে এটি কোনাে কঠিন কাজ নয় ।

২ । দুর্যোগ মােকাবেলায় জাতীয় সক্ষমতাঃ ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে দুর্যোগ প্রস্তুতির ব্যাপারে “ রােল মডেল ” বলা হলেও ঘুড়ি গুণীর ক্ষেত্রে তথ্য বিভ্রান্তিসহ বেশ কিছু অসঙ্গতি প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে । কোনােরকম আত্মতুষ্টিতে না ভুগে , এ বিষয়ে সর্বোচ্চ জাতীয় সক্ষমতা তৈরির যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে । আবহাওয়া অফিসের জন্য সর্বোচ্চ ব্যান্ডউইডথের ওয়েব সাইট ও সকল তথ্য হালনাগাদ করতে হবে ।

৩ । আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ব্যাপারে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিঃ বিশেষ করে উপকূল অঞ্চলে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আবহাওয়ার পূর্বাভাস নির্ণয় , জোয়ার - ভাটার তথ্য তৈরি ও প্রচারসহ তথ্য - প্রযুক্তিগত ভাবে স্থানীয় সরকারের নেতৃত্বে স্থানীয় জনগােষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে । সরকারের অগ্রাধিকার নীতিমালায় যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক তৈরির কথা বলা আছে , তাদের সত্যিকার কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে । এই প্রশিক্ষণ বর্তমানে শুধু মানুষকে ডেকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেয়া ও মাইকে সতর্কতা সংকেত প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ । প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দুর্যোগের সময় কাজের জন্য ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করতে

৪ । ঘুর্ণিঝড় সতর্কতায় ভূমিকা রাখতে কমিউনিটি রেডিওর ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ বৃদ্ধি : উপকূলীয় অঞ্চলে কমিউনিটি রেডিও স্টেশনগুলাে ঘুর্ণিঝড় সতর্কতায় অত্যন্ত সাফল্যের সাথে ভূমিকা রেখে চলেছে । পরিতাপের বিষয় , তাদের জন্য বরাদ্দ ট্রান্সমিটারের ক্ষমতা মাত্র ২৫০ ওয়াট । যেখানে বাণিজ্যিক এফএম রেডিওর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০ কিলােওয়াট । কমিউনিটি রেডিও যেহেতু সম্পূর্ণভাবে জনগণের উপকারার্থে নিয়ােজিত , সেজন্য বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের কমিউনিটি । রেডিও সমূহকে বাণিজ্যিক রেডিওর সমান ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ট্রান্সমিটার ব্যবহারের অনুমতি দিতে হবে , যাতে তারা দূরবর্তী সমুদ্রে মাছ ধরায় নিয়ােজিত জেলেদের জীবন বাঁচাতে ভূমিকা রাখতে পারে । স্থানীয় রেডিও হওয়ায় তারা স্থানীয় জেলে কমিউনিটি সম্পর্কে বেশি খবর রাখে ।

৫ । দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন ও ত্রাণের স্থানীয়করণ : ঘূর্ণিঝড় বা দুর্যোগ পরবর্তী ত্রাণ প্রকল্পে দেশি বা বিদেশি সহায়তা । তহবিলের স্থায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে , বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমিয়ে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে । দাতা সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকল্পের বদলে স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে স্থানীয় সংগঠনের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে ।

৬ । সমুদ্রগামী জেলেদের নিবন্ধন : গভীর সমুদ্রে নৌকা বা ট্রলারযােগে যারা মাছ ধরার কাজে নিয়ােজিত তাদের সকলের নিবন্ধন ও ডাটাবেজ থাকতে হবে, যাতে নিখোঁজ জেলে সম্পর্কে দ্রুত ও নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় ও প্রস্তুতি গ্রহন করা যায় । ঘূর্ণিঝড়ের আগে ফিরে না আসলেও কোন অঞ্চলে মাছ ধরতে গেছে জানা থাকলে তাদের সহায়তা করা সম্ভব ।

৭ । বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলােতে জরুরি ভিত্তিতে ঘুর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র , বেড়িবাঁধ ও কিল্লা নির্মাণ করতে হবে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলাে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা ইউনিয়ন পরিষদভিত্তিক হলে সারাবছর তার রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব ।

৮ । স্থায়িত্বশীল বেড়িবাঁধ : দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চলে জলােচ্ছাস ও জোয়ারের প্রাবন ঠেকাতে ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করতে জনগণের সম্পৃক্ততায় সক্ষম বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে । এ কাজে বর্তমানে নিয়ােজিত পানি উন্নয়ন বোর্ডেরে ব্যাপক সংস্কার না করলে তা সম্ভব নয় ।

৯ । দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ভিত্তিক ক্ষতিপূরণ ও সক্ষমতা তৈরির বিষয়গুলাে সামনে আনতে হবে । দুর্যোগ পরবর্তী কাজ মানেই শুধু ত্রাণ নয়। প্রতিটি দুর্যোগের পর স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সামগ্রিক প্রভাব ও চাহিদা নিরূপণ করতে হবে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী সুপারিশকে দুর্যোগ বিষয়ক জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে ।

১০ । বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও দুর্যোগ - পূর্ব ন্যনতম কিছু প্রস্তুতির জন্য উপজেলা প্রশাসনকে ক্ষমতা ও অর্থ দিতে হবে ।

এছাড়াও তারা সরকার মহল থেকে শুরু করে সব মহলের সচেতনতা কামনা করেন।

 

সাইফুল ইসলাম/জেড