মা তোমার কিছু লাগবে, পান-সুপারি আছে? আমি আসার সময় তোমার জন্য পান-সুপারি নিয়ে আসব। এটিই ছিল মায়ের সঙ্গে হুমায়ুনের শেষ কথা।
এ কথাটিই অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হুমায়ুন কবিরের মা ফিরুজা বেগমকে আজও তাড়া করে বেড়ায়। তিনি শুধু ছেলেকে হারাননি হারিয়েছেন ছেলের বউকেও। অবুঝ দুই শিশু হারিয়েছে তাদের মা-বাবাকে। কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দুই বছর পার হয়ে গেলেও এখনও বিচারকাজ সম্পন্ন না হওয়ায় নিহতদের পরিবার হতাশ। তারা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরের তাজরীন ফ্যাশন নামে একটি পোশাক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার পড়শীপাড়া গ্রামের হুমায়ুন (৩৫) ও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম (৩০) নিহত হন। সেই থেকে দুই নাতিকে নিয়ে আশায় বুক বেধে পথ পাড়ি দিচ্ছেন দাদী ফিরুজা বেগম।
তিনি জানান, বড় নাতি মাহফুজের (৮) বাবার কথা কিছু কিছু মনে থাকলেও মাহিন (৪) বলতে পারে না বাবার কথা। শুধু ছবি দেখে বলতে পারে এটাই তার বাবা।
নিহত হুমায়ুন কবীর ছিলেন দিনমজুর। নিত্য অভাব অনটন নিয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ নিয়েছিল আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনে। বছর ঘুরে আবার নতুন বছর এলেও তাতেও যেন অভাব পিছু ছাড়ছিলো না হুমায়ুনের।
কিছুদিন পর সন্তানদের মায়া ছেড়ে স্ত্রী মাহমুদা বেগমকে নিয়ে যান তাজরিন গার্মেন্টসে শ্রমিকের কাজে। দুই সন্তানকে রেখে যান গ্রামে তাদের দাদীর কাছে। বছর ঘুরে কিছুটা সচ্ছলতার মুখ দেখে মা ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাসা ভাড়া করে বসবাস শুরু করেন আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে তাজরিন ফ্যাশনের পাশে।
কিন্তু তাতে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরার আগেই চালে গেলেন তারা দু’জন। সেসময় তাদের ভাড়া বাড়িটিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুর এদের এতিম দুই সন্তানের সম্বল বলতে ছিল না কিছুই। অগ্নিকান্ডের দুই দিন পর ছেলে ও ছেলের বউএর লাশ নিয়ে বাড়ি ফিরেন মা। সেই সময় ছেলে মাহফুজ ও মাহিনের জন্য ছিল বাবার রেখে যাওয়া মোবাইল, মানিব্যাগ ও বিধবা দাদী। আজ দুই বছর পূর্ণ হলো তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকান্ডের।
হুমায়ুন ও মাহমুদা দম্পতির বাবা-মায়ের মমতাহীন দুই ছেলে এখন একটু বড় হয়েছে। তারা বুঝতে শুরু করেছে তাদের বাবা মায়ের শূন্যতার বিষয়টি। বড় ছেলে মাহফুজ কবীর তার একমাত্র ফুফুর কাছে থেকে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। আর ছোট মাহিন দাদীর কাছে থেকে পড়ে প্রথম শ্রেণীতে।
হুমায়ুনের পরিবারের দাবি- তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
নিহত হুমায়ুনের মা ফিরুজা বেগম বলেন, ‘ছেলে ও ছেলের বউ এর ছবি আগে ঘরে টানানো ছিল। এখন সেই গুলোকে লুকিয়ে রেখেছি। দেখলে কষ্ট আরও বাড়ে।’
নাতিদের নিয়ে কিভাবে চলছেন জানতে চাইলে তিনি আরও জানান, সরকার ও বিজিএমইএ থেকে চারটি চেকে ১২ লাখ টাকা তুলেছেন। এখন বিজেএমইএ থেকে প্রতি মাসে ও বেসরকারি এনজিও কারিতাস থেকে প্রতি তিন মাস পরপর কিছু টাকা পান। তা দিয়ে সংসার আর দুই ছেলের খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। এই টাকা না পেলে দুই নাতিকে মানুষ করার জন্য কষ্ট করতে হতো বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামছুল আলম খোকন জানান, আমি সময় পেলেই ওই দুই বাচ্চার খবর নেই। সরকারী সহায়তা পাওয়ার পর থেকে ভালো ভাবেই কাটছে তাদের দিন। কিন্তু বাবা মা নেই এটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট।
গফরগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজাউল বারী জানান, প্রতি মাসে বা তিন মাস পর পর হুমায়ুনের পরিবার যখন টাকা উঠানোর জন্য আসে তখন দেখা হয়। তারা প্রতি মাসে টাকা পাচ্ছে। ৮ লাখ টাকা পোস্ট অফিসে ডিপোজিট করা আছে। সেখান থেকেও একটা আয় হচ্ছে। সার্বিকভাবে ওরা যে ভালো নেই সেটা বলা যাবে না।
জেআই





