রাজধানীতে মরা মুরগি সরবরাহ চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নামী-দামী হোটেলগুলোতে এই চক্র নিয়মিত মরা মুরগির যোগান দিয়ে যাচ্ছে। হোটেল মালিকের অজান্তেই একটি সিন্ডিকেট এ ধরনের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চায়নিজ রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে গুলশান, বনানী ও উত্তরার নামী-দামী হোটেলেও মরা মুরগি সরবরাহ করে এই চক্র। মরা মুরগির মাংস দিয়ে স্যুপ তৈরি করা হয়। ফাস্ট ফুড স্টোর গুলোতে মুরগির তৈরি সব খাবারে এই মরা মুরগি মাংস ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঢাকার তিনটি বৃহৎ মুরগির আড়ত তেজগাঁও, কাপ্তান বাজার এবং ফকিরাপুল থেকে মরা মুরগি সরাসরি চলে যাচ্ছে এসব হোটেল রেস্টুরেন্টে। বিপণি বিতানেও বিক্রি হচ্ছে মরা মুরগি। প্রতিটি মরা মুরগি ১শ’ থেকে ২শ’ টাকায় বিক্রি করে এই প্রতারক চক্র। ভোক্তারা না জেনেই সরল বিশ্বাসে সেগুলো দেদার খাচ্ছে।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1393689491.jpg[/img]
পিওর ফুড অ্যাক্ট (বিশুদ্ধ খাদ্য আইন)-১৯৬৯’ অনুযায়ী ভেজাল খাদ্যদ্রব্য বিক্রেতার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকরী কোন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায় না। একই অপরাধী একাধিকবার একই অপরাধে ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলে বেড়িয়ে আবার এই অপকর্মে জড়িয়ে পড়লেও দেখার যেন কেউ নেই।
গত বৃহস্পতিবার ভোর থেকে রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন এলাকায় এক ভেজাল বিরোধী অভিযান চালায় র্যারবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে র্যা ব-২-এর একটি দল তেজগাঁও রেলস্টেশনে মুরগির আড়তে অভিযান চালিয়ে মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগে নারীসহ দুজনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার আলীপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন (৪৫) ও ময়মনসিংহের সদর উপজেলার বড়বাড়ী এলাকার আসমা বেগম (৪০)।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দেলোয়ার ও আসমাকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও অনাদায়ে আরও তিন মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।[img]http://www.timenewsbd.com/contents/public/201403/1393689520.jpg[/img]
র্যা বের জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা দোষ স্বীকার করে জানান, দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী আড়ত থেকে ঢাকায় আনতে যে সব মুরগি মারা যায় সেসব মুরগি সংগ্রহ করা হয় ২০ থেকে ৫০ টাকায়। এগুলোই হোটেল রেস্টুরেন্টে বিক্রি করা হয় দেড়শ’ থেকে দুশ’ টাকায়।
দেশের বিভিন্ন দূরবর্তী আড়ত থেকে ঢাকায় আনতে যে সব মুরগি মারা যায় সেসব মুরগি মাছের খামারে দেওয়ার কথা বলে সংগ্রহ করে ২০ থেকে ৫০ টাকায়। এরপর এই মুরগি জ্যান্ত বলে বিক্রি করেন।
আটককৃত দেলোয়ার ও আসমা বেগম আরও জানান, রাজধানীর তিনটি বড় মুরগির আড়তের মধ্যে কাওরান বাজার রেলগেট মুরগির আড়ত সবচেয়ে বড়। এখানে প্রতি রাতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ট্রাকযোগে দেড় থেকে দুই লাখ মুরগি আসে। ভোরের মধ্যে আড়ত মুরগিতে ভরে যায়। এরমধ্যে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার মুরগি মারা যায়।
গরম বেশি পড়লে মরা মুরগির সংখ্যা দ্বিগুণ হয়। ব্রয়লার মুরগি হিটস্ট্রোকে এবং চাপে পড়ে বেশি মারা যায় বলে জানান আড়ত মালিকরা। একেকটি মরা মুরগির জন্য ১০ থেকে ২০ টাকা দিতে হয়।
মরা মুরগির পাখা পশম ছিলার জন্য আড়তের পাশে ছোট ছোট ঘর রয়েছে। সেখানে মরা মুরগি ছিলার কাজ শেষে বস্তাবন্দী করা হয়। কোন মরা মুরগি দুর্গন্ধ হলে সেগুলোর মধ্যে লেবুর রস দিয়ে দুর্গন্ধমুক্ত করা হয় বলে তারা জানায়।
হোটেলে সরবরাহ করে আরেক গ্রুপ: প্রথম গ্রুপ মরা মুরগি সংগ্রহ করে তা ছিলে বস্তাবন্দী করে দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে বিক্রি করে। দ্বিতীয় গ্রুপ এ জন্য প্রথম গ্রুপকে একেকটি মুরগির জন্য দেয় ৪০- ৫০ টাকা। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের একেকটি মুরগি রেস্টুরেন্টে বিক্রি হয় দেড়শ’ থেকে দুশ’ টাকা।
সরবরাহকারী কেউ এখন কোটিপতি: দণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুজন আরও জানান, অনেক নামকরা চায়নিজ রেস্টুরেন্ট ও ফাস্ট ফুডের দোকানের কর্মচারীরা মালিকের অজান্তে মরা মুরগি সরবরাহে সহযোগীতা করে আসছে। অনেক আড়তের মুরগি ব্যবসায়ী এবং শ্রমিকেরা মরা মুরগি বিক্রেতাদের চিনলেও লভ্যাংশের লোভে এ অপকর্মের প্রতিবাদ করে না। মরা মুরগি বিকিকিনি চক্রের কয়েকজন এখন কোটিপতি। তারা পুরনো ব্যবসা ছেড়ে এখন অন্য ব্যবসা করছেন। তবে মরা মুরগি বিকিনিকির সাথে রয়েছে তাদের গোপন যোগাযোগ।
ফ্রিজিং করে প্রতারণা: মরা মুরগী ফ্রিজে সংরক্ষণ করে প্রতারক চক্র। পরে ফ্রিজিং (হিমায়িত) করা মুরগীর মাংস বাজারে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে মাংস জীবিত নাকি মরা মুরগীর তা বোঝা দুষ্কর হয়ে পড়ে। অনেক ক্রেতাই সরল বিশ্বাসে ফ্রিজিং করা মুরগী কিনে থাকেন। আর বিক্রেতারা এ সুযোগটিই কাজে লাগায়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশা দণ্ডপ্রাপ্তদের বরাত দিয়ে জানান, মরা মুরগি বিক্রির সাত সদস্যের একটি চক্র আছে। এরা বিভিন্ন রেস্তোরাঁয়ও এই মরা মুরগি বিক্রি করে। প্রতিদিন তাঁরা এক লাখ টাকার মতো মরা মুরগি বিক্রি করেন এবং চক্রের সদস্যরা সমানুপাতে ভাগ করে নেন।
তিনি আরও জানান, ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল মরা মুরগি বিক্রির অভিযোগে র্যা বের ভ্রাম্যমাণ আদালত এই দেলোয়ারকে গ্রেফতার করে দুই বছর কারাদণ্ড দিয়েছিল। এর নয় দিন পর ওই স্থানে মরা মুরগি বিক্রি করার অভিযোগে দেলু, রেশমা, গোলাম হোসেন ও শাহ আলমকে কারাদণ্ড দেন। বছর খানেক আগে দেলোয়ার জামিনে বেরিয়ে আবার মরা মুরগির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।
মরা মুরগি ভক্ষণ মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর: কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, মুরগি সাধারণত বার্ড ফ্লু কিংবা কোন ভাইরাসজনিত কারণে মারা যায়। মরা মুরগির মাংস খেলে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা শতভাগ। পরবর্তীতে লিভার ও কিডনি রোগে আক্রান্ত কিংবা কিডনি অকেজো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এবিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব)’র সভাপতি ফারুক আহমেদ জানান মৃত মুরগীর মাংস বিক্রির অভিযোগটি আমাদের কাছেও এসেছে। আমরা সরেজমিন বাজার মনিটরিং করছি।
তিনি জানান, ‘প্রতারক বিক্রেতারা ফ্রিজিং প্রক্রিয়ায় মরা মুরগির মাংস বিক্রি করেন। এই প্রক্রিয়ার কারণে চেনার উপায় থাকে না সেটি জীবিত না মৃত ছিল। আমরা প্রায়শই অভিযান চালিয়ে থাকি। শীঘ্রই গোপন অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা, জেইউ, ১ মার্চ (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসআর
জাতীয়
মরা মুরগির দেদার বিক্রি: সরবরাহকারীরা কেউ কোটিপতি
রাজধানীতে মরা মুরগি সরবরাহ চক্র আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। নামী-দামী হোটেলগুলোতে এই চক্র নিয়মিত মরা মুরগির যোগান দিয়ে যাচ্ছে। হোটেল মালিকের অজান্তেই একটি সিন্ডিকেট এ ধরনের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। চায়নিজ রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে গুলশান,





