টানা অবরোধ ও হরতালের কারণে রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠ মুন্সীগঞ্জ জেলায় আলু কেনা-বেচায় ধস নেমেছে। জেলার ৫০ হাজার আলু চাষির মাথায় হাত ও স্বপ্ন ফিঁকে হয়ে আসছে। আলু উত্তোলনের শুরুতে এবার লাভের মুখ দেখছেন না চাষিরা। উপরন্তু হরতালের কবলে পরিবহণের অভাবে দেশের বড় বড় মোকামের পাইকাররা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। মুন্সীগঞ্জের চাষিদের কাছ থেকে আলু কিনছেন না পাইকাররা।

জেলা সদরের মোল্লাকান্দি, চরকেওয়ার ও আধারা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। আলু উত্তোলনের মহা উৎসব শেষে টানা অবরোধ ও হরতালের কবলে পরিবহণের অভাবে এখন লাখ লাখ টন আলু বিক্রি বা বাজারজাত করতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা।

এতে মুন্সীগঞ্জে উৎপাদিত ১৫-১৬ লাখ বস্তাভর্তি আলু পড়ে আছে বাড়ির আঙ্গিনা ও জমিতে। এ বিপুল পরিমাণের আলু বাজারজাতকরণে কোনো পরিবহণ পাচ্ছেন না চাষিরা। দেশের আলুর ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত মুন্সীগঞ্জের বিশাল পরিমাণের আলু অবিক্রিত থেকে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আলু নিয়ে দুর্ভাবনায় পড়েছেন চাষিরা। আলু চাষিদের স্বপ্ন ধুসর হয়ে উঠেছে। শুধু মাত্র সদর উপজেলার চরাঞ্চলের পাঁচটি ইউনিয়নে কয়েক লাখ বস্তাভর্তি আলু পড়ে আছে। সারা জেলা জুড়ে পড়ে আছে অন্তত ১৮ লাখ বস্তা আলু।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানান, দেশের বৃহৎ উৎপাদনকারী অঞ্চল মুন্সীগঞ্জে এবার ৩৭ হাজার ছয়শ’ হেক্টর জমিতে এবার প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টন আলু জেলায় সচল থাকা ৬৭টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বাকি ৯ লাখ টন আলু বাজারজাতকরণের পরিবেশ পাচ্ছেন না চাষিরা

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হরতালের কারণে জেলা সদরের মোল্লাকান্দি, চরকেওয়ার, শিলই, আধারা ও বাংলা বাজার ইউনিয়নের মাঠে-ময়দানে খোলা আকাশের নিচে কয়েক লাখ বস্তাভর্তি আলু স্তুপ আকারে রয়েছে।

এমনিতে এবার মুন্সীগঞ্জে আবাদ করা প্রায় ৯ লাখ মেট্রিক টন আলু কোল্ড স্টোরেজের অভাবে সংরক্ষণ করতে পারছেন না চাষিরা। উপরন্তু সীমিত সংখ্যক কোল্ড স্টোরেজগুলোতে অগ্রিম কোটা বিক্রি হয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত আলু সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন চাষিরা। জেলার ছয়টি উপজেলার সচল থাকা ৬৭টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন আলু বাদে বাকি আট লাখ টন আলু সংরক্ষণ করতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। তাই বিপুল পরিমাণের এ আলু বাজারজাত করা ছাড়া চাষিদের কাছে কোনো উপায় নেই।

জেলা সদরের চরাঞ্চল আধারা ইউনিয়নের তাঁতিকান্দি গ্রামের আলু চাষিরা বলেন, গেলো কয়েক বছরের লোকসান পুষিয়ে এবার লাভের স্বপ্ন দেখেছিলেন চাষিরা। কিন্তু উৎপাদন খরচ ও বর্তমান বিক্রি দর কাছাকাছি হওয়ায় আলু আবাদে চাষিরা লাভ-লোকসানের মাঝখানে পড়েছেন। কোল্ড স্টোরেজেও সব আলু সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি উৎপাদিত আলুর বর্তমান দর অনুযায়ী লাভের মুখ দেখছেন না চাষিরা। উপরন্তু টানা অবরোধ-হরতালের কারণে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ বাদে লাখ লাখ বস্তাভর্তি আলু বিক্রি করতে পারছেন না চাষিরা।

মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আল মামুন জানান, চলতি বছর জেলায় ৩৫ হাজার একশ’ ৪৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে এবার জেলায় ৩৭ হাজার ছয়শ’ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে।

এ দিকে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের আলু চাষি সাইদুর রহমান সাইদ জানান, হরতালে পরিবহণের অভাবে উৎপাদিত আলু দেশের বিভিন্ন হাট-বাজারে সরবরাহ করতে পারছেন না

শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর এলাকাস্থ মাল্টি পারপাস কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আব্দুল হান্নান বলেন, ‘এ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবসায়িক সুনাম রয়েছে। ইতিমধ্যে ৪০ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। এমন ৬৭টি কোল্ড স্টোরেজ জেলায় সচল রয়েছে। সব কোল্ড স্টোরেজ মিলিয়ে সর্বোচ্চ সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ সম্ভব। তাই জেলা উৎপাদিত প্রায় ১৩ লাখ টন আলুর মধ্যে ৯ লাখ টন আলু বাজারজাতকরণ ছাড়া আর কোনো উপায় নাই।’

সদর উপজেলার চরাঞ্চলের চরকেওয়ার ইউনিয়নের টরকী গ্রামের বরকত মৃধা কয়েক হাজার বস্তা আলু বিক্রি করতে পারছেন না।

তিনি জানান, হরতাল-অবরোধের কারণে কোনো পরিবহণই পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবহণ মালিক-শ্রমিকরা হরতালে পিকেটারদের হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় রাস্তায় নামাচ্ছেন না ট্রাক-লরিসহ অন্যান্য মালামাল বহনকারী যানবাহন।

জেআই