নিখোঁজের পাঁচ দিন পর রংপুর জজ আদালতের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও জেলা আওয়ামী লীগের আইন সম্পাদক রথীশ চন্দ্র ভৌমিকের লাশ উদ্ধার করেছে র‌্যাব।

তাদের দাবি, রথীশকে হত্যার নেপথ্যে ছিল স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের পরকীয়া আর পারিবারিক কলহ। মঙ্গলবার রাত ১১টায় শহরের তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের ভেতর থেকে মাটি খুঁড়ে রথীশের লাশ উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব জানায়, রথীশকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় দুই মাস ধরে। গত ২৯ মার্চ রাতে দুধ-ভাতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার পরকীয়া প্রেমিক কামরুল ইসলাম।

রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন রথীশ। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।

স্বামী ‘নিখোঁজের’ পর স্নিগ্ধা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ৩০ মার্চ ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে রওনা হয়েছিলেন রথীশ। এরপর থেকে তার সন্ধান তারা পাচ্ছেন না।

নিখোঁজের পর ট্রাস্টের নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ায় জামায়াতে ইসলামী, জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা ভূমিদস্যুরা রথীশকে ধরে নিয়ে গেছে।

ঘটনার পর সোমবার পাঁচ জামায়াত নেতাসহ সন্দেহভাজন নয়জনকে আটক করে পুলিশ। এরপর মঙ্গলবার দুপুরে রথীশের বাড়ির পাশে একটি ডোবায় তল্লাশি শুরু হয়।

এসময় হালকা রক্তের ছিটা লাগানো সাদা একটি শার্ট উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি মাহিগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে নেয়া হয়। রথীশের ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক শার্টটি তার ভাইয়ের নয় বলে পুলিশকে জানান।

র‌্যাব জানায়, তারা পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেও তদন্তে নামেন। এরপর রথীশের স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করা হয়।

কললিস্টে দেখা যায়, প্রতিদিন তারা দু’জন ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলতেন। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে শনিবার রাতে শিক্ষক কামরুল ইসলামসহ দু’জনকে আটক করা হয়। এরপর তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।

কামরুলের বক্তব্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে স্নিগ্ধ ভৌমিককে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার স্বীকারোক্তিতে পরে লাশ উদ্ধার করা হয়।

স্বামী রথীশকে হত্যার পুরো ঘটনা র‌্যাবের কাছে বর্ণনা করেছেন স্নিগ্ধ রাণী ভৌমিক। তিনি র‌্যাবকে জানান, দুই মাস ধরে রথীশকে হত্যার পরিকল্পনা করেন তারা। সেই অনুযায়ী ২৯ মার্চ রাত ১০টার দিকে ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি খাওয়ানো হয় রথীশকে। কামরুল আগে থেকেই সেখানে লুকিয়ে ছিলেন।

রথীশ অচেতন হয়ে পড়লে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর রাতে রথীশের লাশ রেখে দেয়া হয় তারই শয়নকক্ষে।

পরদিন ভোরে কামরুল ওই বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। একটি আলমারি পরিবর্তনের নাম করে সেই আলমারিতে লাশ ভরে নিয়ে যাওয়া হয় তাজহাটের মোল্লাপাড়ায় কামরুলের বড় ভাই খাদেমুল ইসলামের নির্মাণাধীন ভবনে। সেখানে লাশ পুঁতে ফেলার জন্য আগে থেকেই একটি কক্ষে বালি খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছিল।

কামরুল তার দুই ছাত্রকে ৩০০ টাকা করে দিয়ে ওই গর্ত খোঁড়ার কাজটি করিয়েছিলেন। তাদেরকেও র‌্যাব আটক করেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা বলেছে, শিক্ষকের নির্দেশে তারা ওই কাজ করেছে।

রথীশচন্দ্র নিখোঁজ হওয়ার পর তার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক গত ১ এপ্রিল অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেটাকে মামলা হিসেবে নিয়ে স্নিগ্ধ, কামরুলসহ চারজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাবুল মিঞা সাংবাদিকদের জানান, লাশের গলায় শুধু দাগ রয়েছে। পরনে শার্ট-প্যান্ট ও পায়ে জুতা ছিল। লাশ পেঁচানো ছিল বিছানার চাদর ও লুঙ্গি দিয়ে।

রথীশের দুই সন্তানের মধ্যে ছেলে বড়। তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ঘটনার সময় তিনি ঢাকাতেই ছিলেন। আর ছোট মেয়ে পড়ালেখা করছে রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণিতে। ঘটনার রাতে সে ছিল তার এক পিসির বাড়িতে।

জেড