‘প্রিয় মা, আমাকে ক্ষমা করো। আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী নাসরিন মিস, মুন্না স্যার আমাকে মারছে, পুরো স্কুল আমারে নিয়া হাসাহাসি করছে। মা আমি এই অপমান সহ্য করতে পারি নাই। তাই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলাম। আমাকে মাফ করে দিও।’

একমাত্র সন্তানের এমন আত্মহননের চিরকুট বুকে নিয়ে কাঁদছেন নবম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রী ওম্মে হাবিবা শ্রাবণীর বাবা-মা। নকলের অভিযোগে অতিমাত্রায় মারধর আর স্কুলের মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখার অপমান সহ্য করতে না পেরে স্কুল পোশাক পরিহিত অবস্থাতেই ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে শ্রাবণী।

বৃহস্পতিবার বিকালে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও শুক্রবার বিষয়টি জানাজানি হয়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত স্কুলের শিক্ষক কামরুল হাসান মুন্না পলাতক রয়েছেন।

জানা যায়, সন্ত্রাসী বরিশাইল্যা ফিরোজ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হয়েও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র হাজী ওবায়েদ উল্লাহর ভাগিনা হওয়ার সুবাদে স্কুলের চাকরি পায় মুন্না। অপরদিকে বিদ্যালয়ের একজন মেধাবী ছাত্রীর এমন ঘটনার একদিন পরই কাণ্ডজ্ঞানহীন আচরণ করে স্কুলের ভেতরে ভূরিভোজের আয়োজন করে ব্যাপকভাবে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষক এম এ কাউয়ুম।

বৃহস্পতিবার বিকালে নিহত স্কুলছাত্রীর লাশ যখন হাসপাতাল মর্গে তখন স্কুলের প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষক সব ঘটনা জেনেও শুক্রবার স্কুলে ভূরিভোজ সেরেছেন। শ্রাবণী মারা গেছে- এমনটা জেনেও না জানার অভিনয় করে প্রধান শিক্ষক কাউয়ুম ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চালান।

জানা যায়, নবম শ্রেণীর ছাত্রী ওম্মে হাবিবা শ্রাবণী বৃহস্পতিবার জীববিজ্ঞান পরীক্ষা দেয়ার সময় নকল পাওয়া গেছে- এমন অভিযোগে শিক্ষিকা নাসরিন সুলতানা ও তানজিলা তাহরিন পরীক্ষার খাতা ছিনিয়ে নিয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক আবদুল জব্বারের কাছে নিয়ে যায়।

এ সময় স্কুল ম্যানেজিং কমিটির লোকজনের সামনে শ্রাবণীকে মারধর করে স্কুলের বিতর্কিত শিক্ষক কামরুল ইসলাম মুন্না। এরপর শ্রাবণীকে স্কুলের মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। সবার সামনে মারধর ও অপমানের পর হাসাহাসি ও ঠাট্টা করার ঘটনা সইতে না পেরে বাড়িতে ফিরে নামাজ পরে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না দিয়ে ফাঁস দেয় শ্রাবণী।

ভাড়াটিয়া বাড়ির অন্যরা শ্রাবণীকে ঝুলতে দেখে দ্রুত নামিয়ে নারায়ণগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক নাজমুল হোসেন শ্রাবণীকে মৃত ঘোষণা করেন। এ খবর পেয়ে গণবিদ্যা নিকেতন উচ্চবিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ যাতে ময়নাতদন্ত না হয় সে লক্ষ্যে ভিন্ন উপায়ে পরিবারকে দিয়ে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।

ঘটনা জানাজানি হলে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষকসহ অন্যরা দায় এড়াতে হাসপাতাল ও নিহতের বাড়ি যান। শুক্রবার সকালে শ্রাবণীর লাশ ময়নাতদন্ত শেষে চিরকুটটি উদ্ধার করে পরিবারের লোকজন।

ময়নাতদন্ত শেষে সদর থানা পুলিশ নিহতের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলে গ্রামের বাড়ি ফেনীতে রওনা হয় বিকাল ৪টায়। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুল মালেক বলেন, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ দায়েরের পর আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এআই