সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তা আর নিষেধাজ্ঞার ভিতরে আজ থেকে শুরু হতে যাচ্ছে জোরপূর্বক রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। কারণ প্রথম দিনের প্রত্যাবাসেনর তালিকাভূক্ত ৩০ পরিবারের অনেকেই মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নন। কিছু রাজি থাকলেও অধিকাংশই এই প্রত্যাবাসনের বিরোধীতা করছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ২২৬০ জনকে এই প্রত্যাবাসনের আওতায় ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু অনেকেই জানে না তাদেরকে এই প্রাথমিক তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। অনেকে জানার পরে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে গেছে। তাই এই প্রত্যাবাসন অনেকটাই জোরপূর্বক।
এদিকে এই প্রত্যাবাসনের প্রথম থেকেই বিরোধীতা করে আসছে আন্তর্জাতিক মহল। বিশেষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর চরম বিরোধীতা করছে।
সম্প্রতি এই প্রত্যাবাসনের পরিকল্পনা স্থগিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশেলেত বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জীবন ও স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। গত মঙ্গলবার জেনেভাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি সরকারের প্রতি এই আহবান জানান।
বিবৃতিতে তিনি রাখাইন রাজ্যের সংকট বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চালানো পদ্ধতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের মূল কারণ সমাধান করে তাদের ফেরানোর জন্য পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারকে আন্তরিকতা দেখানোরও আহ্বান জানান।
যেকোনো ধরনের প্রত্যাবাসন যাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, সম্মানের সাথে, পূর্ণ স্বচ্ছতায় এবং শুধুমাত্র সঠিক পরিবেশে হয় তা সতর্কতার সাথে নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন হাইকমিশনার বাশেলেত।
বিবৃতিতেও তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস সহিংসতা, পলায়ন ও ফেরার পুনরাবৃত্তিমূলক পর্বে পরিপূর্ণ। এই চক্রের পুনরাবৃত্তি রোধে আমাদের এক হয়ে কথা বলা দরকার।’
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য স্টার অনলাইনে এই প্রত্যাবাসনে ভীত রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক রিপোর্টে করুণ আর্তনাদ ফুটে উঠেছে। বলা হয়েছে, প্রত্যাবাসন তালিকায় নাম ওঠা রোহিঙ্গারা এতটাই ভীতির মধ্যে রয়েছেন যে তাদের অনেকেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
৫৮ বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ওই তালিকায় নাম ওঠার খবরে হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছেন বলেও জানানো হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সূত্রগুলো রোহিঙ্গাদের নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দেয়া এবং মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেনি। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও এমন তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকার করেনি।
তবে তারা খোঁজ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন। “রোহিঙ্গাস ফিয়ারস গ্রো এজ রিফিউজিস ফেস ফোরসিবলি রিটার্ন টু মিয়ানমার” শিরোনামে রিপোর্ট করেছে গার্ডিয়ান। যার উপ-শিরোনাম ছিল “এইড এজেন্সিস গিভ ওয়ার্নিং এজ মিয়ানমার অ্যান্ড বাংলাদেশ বিগিন রিটার্ন অব ‘টেরিফাইড’ রিফিউজিস টু রাখাইন স্টেট”। রিপোর্টের সূচনাতে বলা হয়েছে জাতিসংঘের আপত্তি এবং রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার হাজারও রোহিঙ্গাকে এই সপ্তাহে রাখাইনে ফেরাতে পরিকল্পনা নিয়েছে।
গার্ডিয়ানের রিপোর্টে মুহাম্মদ আয়াজ নামে একজনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, আয়াজ বলেছেন, ‘জোরপূর্বক’ প্রত্যাবাসন নিয়ে কয়েক দিনের দুশ্চিন্তা এবং নিন্দ্রাহীনতায় কাটানোর পর গত সপ্তাহে তার বাবা মুহাম্মদ শাকের (৫৮) হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।
তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগেও বাবা আমাকে বলছিলেন তোমার ভাই-বোনদের লুকিয়ে ফেল। তাদের ফেরত পাঠানো থেকে বাঁচাও। তোমরা মিয়ানমারে ফিরো না। যদি যাও সেখানে তোমাদের আবারও সহিংসতার মুখে পড়তে হবে।’
তবে আজ বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও তাদের একটি বড় অংশ নিজ দেশে ফেরত যেতে চাচ্ছে না বলে কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে গোটা প্রক্রিয়া।
বুধবার (১৪ নভেম্বর) রাতে ত্রাণ, শরণার্থী ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মাদ আবুল কালাম কক্সবাজারে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কালকে (বৃহস্পতিবার) আমরা প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত বলতে পারবো।’
জানা যায়, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা মঙ্গলবার এবং বুধবার ৫০ পরিবারের ইন্টারভিউ নিয়েছে এবং অনেকে ফেরত যাওয়ার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। এর ফলে ফেরত পাঠানোর গোটা প্রক্রিয়াটি কিছুটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে।
এ বিষয়ে আবুল কালাম আরও বলেন, ‘আমরা শরণার্থী সংস্থার রিপোর্ট পেয়েছি এবং ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সিদ্ধান্তের জন্য পাঠিয়েছি।’
উল্লেখ্য, মিয়ানমার সীমান্তে সেনা চৌকিতে হামলার অভিযোগ এনে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালায় মিয়ানমার সেনারা ও স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠিরা। যেটাকে আন্তর্জাতিকভাবে সম্পূর্ণ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রোহিঙ্গারা জাতিগত নিধনের স্বীকার বলে অভিহিত করা হয়।
এদিকে গত বছরের আগস্ট মাসের পর থেকে মিয়ানমারে হত্যা, নির্যাতন ও বাড়িঘরে আগুনের ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এছাড়া আগে থেকে রয়েছে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গার বসবাস বাংলাদেশে।
জেড





