তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। ২৫০ কোটি টাকার ৫টি উন্নয়ন প্রকল্পে মিলছে না বরাদ্দ। প্রতি মাসে সরকারিভাবে আসা থোক বরাদ্দের টাকাও ঠিকমতো দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়।

বাকি পড়েছে যানবাহনের জ্বালানি খরচসহ ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকার পাওনা।প্রায় ৩ মাস ধরে বন্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন।এমন বিরূপ পরিস্থিতির চাপে দিশেহারা মেয়র, কাউন্সিলরসহ পুরো নগরভবন।

এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন দূরের কথা, নাগরিক সেবার অতি জরুরি সেক্টরগুলোই চালিয়ে রাখা হচ্ছে বহু কষ্টে। সূত্র জানায়,সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পরাজয় ও বিএনপি সমর্থিত আহসান হাবিব কামালের বিজয়ই এই জটিলতার নেপথ্য কারণ। সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার হচ্ছে এই সিটি কর্পোরেশন।

২০১৩ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বরিশালে সরকার দল সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনকে হারিয়ে সিটি মেয়র হন বিএনপির সাবেক জেলা সভাপতি আহসান হাবিব কামাল। মেয়াদ সংক্রান্ত জটিলতায় তার দায়িত্ব পেতে লেগে যায় প্রায় ৪ মাস।

গত বছরের ১৫ নভেম্বরে মেয়র হিসেবে নগরভবনে প্রথম পা রাখেন কামাল। এরপর ১৩ মাস যাবৎ পালন করছেন নগরপিতার দায়িত্ব। কামাল দায়িত্বে বসার পর থেকেই একটু একটু করে অর্থ সংকটে পড়তে শুরু করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। এখন তা ধারণ করেছে ভয়াবহ রূপ। দায়িত্বশীল সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আহসান হাবিব কামাল দায়িত্ব নেয়ার সময়ই ৩ মাস বকেয়া ছিল নগরভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন।

এরপর থেকে প্রতি মাসে বেতন দেয়া হলেও সেই ৩ মাসের বকেয়া পরিশোধ করতে পারেনি নগর পরিষদ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন নাগরিক সেবা সম্পাদনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত উপাদানের মূল্য বাবদ পাওনা। একটি সূত্র জানায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পানি সরবরাহ আর সড়ক বাতি নিশ্চিত করতে যেসব যানবাহন ব্যবহৃত হয় সেগুলোর জ্বালানি বাবদ মোটা অংকের টাকা পাওনা রয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের। কখনও কখনও পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা।

এছাড়াও নগরীর রাস্থা ঘাট সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ চালু থাকলেও এসব খাতে কোটি কোটি টাকার বিল পাওনা রয়েছে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। কর্পোরেশনের প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে অনেকটা হাতে-পায়ে ধরে তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। কিন্তু এভাবে আর হয়তো বেশিদিন চলবে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে অনেকটা নিজস্ব আয় দিয়েই চলছে সিটি কর্পোরেশন। পানির বিল, সিটি ট্যাক্স, স্টল বিক্রি এবং ভাড়া বাবদ আয়ের সামান্য টাকায় চলছে নাগরিক সেবা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা। আগে প্রতি মাসে সিটি কর্পোরেশন পরিচালনার ব্যয় নির্বাহে সরকারের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ পাওয়া যেত। বিএনপি সমর্থিত কামাল মেয়র হওয়ার পর সেটা প্রায় বন্ধ। এখন প্রতি ৬ মাসে একবার টাকা আসে।

গত ১৪ মাসে এই খাতে মাত্র ৪ কোটি টাকা পেয়েছে বরিশাল নগরভবন। প্রায় ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ ৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ আটকে আছে স্থানীয় সরকার, বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনে। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকা কালীন এসব প্রকল্প অনুমোদন পায়।

প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ের নগর সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প, ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ের ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প, ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর ৩টি খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প, ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে হরিজন সম্প্রদায়ের জন্য সেবক কলোনি নির্মাণ প্রকল্প এবং ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে সোলার বাল্ব স্থাপন প্রকল্প। নগরভবনের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, মেয়র পদে হিরন হেরে যাওয়ার পর ঝুলে যায় এসব প্রকল্পের ভবিষ্যৎ।

এছাড়া বিএমডিএফের (বাংলাদেশ মিউনিসিপ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড) ৪০ কোটি টাকার নিয়মিত প্রকল্পের বরাদ্দ পর্যন্ত আটকে আছে ঢাকায়। নগরভবনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, প্রতি মাসে আমাদের নিজস্ব আয় রয়েছে প্রায় সোয়া ৩ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে কেবল বেতন-ভাতা খাতেই প্রয়োজন হয় আড়াই কোটি টাকার বেশি। বাকি মাত্র ৭৫ লাখ টাকা দিয়ে কিভাবে প্রায় ৬ লাখ নগরবাসীর সেবা করব বলুন আটকে থাকা প্রকল্পের অর্থছাড় বিষয়ে তদবির করতে গত নভেম্বর মাসে ঢাকায় গিয়েছিলেন নগরভবনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান মো. নূরুল ইসলাম।প্রায় ২০ দিন ঢাকায় ছিলেন তিনি।

সেখান থেকে আশাব্যঞ্জক কোনো খবর নিয়ে আসতে পারেননি তিনি।সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে বরিশাল সিটি মেয়র আহসান হাবিব কামাল বলেন, আমি বিএনপি সমর্থিত মেয়র বলে যদি বরিশাল নগরীর লাখ লাখ মানুষকে উন্নয়ন বঞ্চিত রাখা হয় সেটা আসলেই দুঃখজনক। বর্তমান সরকার সারা দেশে ব্যাপক উন্নয়ন করার কথা বলছে। বরিশাল দেশের বাইরে নয়। আটকে থাকা প্রকল্পের অর্থছাড় এবং নিয়মিত থোক বরাদ্দ দেয়ার মাধ্যমে সরকারের উচিত বরিশাল নগরীর উন্নয়ন অব্যাহত রাখা।

এই নগরীর উন্নয়ন যদি বন্ধ থাকে তাহলে জনগণ আমাকে ব্যর্থ বলবে না। কারণ তারা জানে যে সরকার টাকা দেয়নি বলে আমি কিছু করতে পারিনি। আর যদি স্বাভাবিক গতিতে উন্নয়ন চলে তাহলে তার সাধুবাদ সরকারের ঘরেই যাবে। তখন সবাই বলবে, বিরোধী দলের মেয়র থাকার পরও সংকীর্ণ মানসিকতা দেখায়নি সরকার। এখন তারা দোষ নাকি গুণের ভাগ নেবেন সেটা তাদের ব্যাপার। তবে এ কথা ঠিক যে, আমরা বর্তমানে বিমাতাসুলভ আচরণের শিকার।

এসএইচ