সুখজান নেছা বৃষ্টি (১৫)। নামে সুখ থাকলেও বাস্তবতা যেন একেবারেই ভিন্ন। যে বয়সে পাড়ার সমবয়সীদের সঙ্গে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা আর নাচ-গানে মাতিয়ে রাখার কথা। তখন সুখজান বন্দি অবস্থায় জীবন পার করছে। যে সময়ে কিশোরীরা হাতে চুড়ি, গলায় মালা, পা রাঙ্গিয়ে ঘুঙুর পরে, সেখানে সুখজানের গলায় ও পায়ে শেকল, সঙ্গে দুটি তালাসহ ভাঙাচোরা খুপড়ি ঘরের বাঁশের খুঁটিতে পশুর মতো বাঁধা! পাবনার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের ধানকুনিয়া সরকারপাড়া গ্রামে জীর্ণ-শীর্ণ ঘরে দিনরাত এভাবেই শেকলবন্দি হয়ে থাকতে হয় সুখজানকে! এভাবেই তার জীবন থেকে ঝরে গেছে দশটি বছর। কারণ সে মানসিক রোগী। পাবনা জেলা শহরে মানসিক হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও তার ন্যূনতম চিকিৎসাটুকুও হয়নি।
অনেকটা বাবা-মাহারা অসহায়ত্ব নিয়েই কোনো রকম বেঁচে আছে সুখজান। জন্মের পর মারা যান মা রোজিনা খাতুন। বাবা মনিরুল ইসলামও আরেকটি বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেছেন। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে অবশেষে শতবর্ষী এক বুড়ি মা (মায়ের দাদি) রাহেলা বেগমের কাছে আশ্রয় মিলেছে তার। এখন রাহেলা বেগমের শঙ্কা ‘আমি মরে গেলে ওকে কে দেখবে?’
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঝুপড়ি একটি ঘরে বুিড় মায়ের সঙ্গে বসে আছে সুখজান। পরনে ছেঁড়া কাপড়। বাঁশের খুঁটির সঙ্গে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে তাকে। শেকলের ভারে ঘাড় শক্ত হয়ে গেছে। তবুও নেই কোনো অনুভূতি। এই প্রতিবেদককে দেখে সুখজান বলে ওঠে, ‘পাবনা যাব, ডাক্তার দেখাব।’ কিছু সময় পর আবারো বলে ওঠে, ‘মাথা শট, মাদ্রাজ যাব, চিকিৎসা করাব। ব্রেনের চিকিৎসা করাব।’ এ সময় চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বসতে বলে সে।
বছর চারেক আগে ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আল মামুন সুখজানকে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং রাহেলা বেগমকে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। সেই ভাতার টাকা দিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটে বৃষ্টি ও রাহেলা বেগমের। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বুড়ি মা রাহেলা বেগম টাকার অভাবে সুখজানের চিকিৎসা করাতে পারেননি। এদিকে রাহেলা বেগমের ছেলেদের এ ব্যাপারে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ভাতার টাকা তাদের কাছে দিলে মেলে খাবার, নয়তো না খেয়েই থাকতে হয়। তবে চিকিৎসা করালে সুখজান ভালো হতে পারে বলে ধারণা প্রতিবেশীদের।
রাহেলা বেগম জানান, ৫ বছর বয়স থেকে তার (সুখজান) পাগলাটে ভাব শুরু হয়। মাঝে মধ্যেই বাড়ি থেকে বের হয়ে যেত। তাকে কেন্দ্র করে পাড়া প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ লেগে থাকত। অন্যের বাড়ির জিনিসপত্রও মাঝে মাঝে নষ্ট করত। এ ছাড়া মাঝে মধ্যে হারিয়ে যেত। কোনো উপায় না পেয়ে ভয়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে বৃষ্টিকে। রাহেলা বেগম বলেন, ‘মাঝে মধ্যে সুখজান মায়ের কাছে যাব বলে আবদার করে। কিন্তু ওর মা তো পৃথিবীতে নেই!
ধানকুনিয়া গ্রামের শিক্ষক এসএম ফিরোজুর রহমান বলেন, শেকল দিয়ে বেঁধে রাখার বিষয়টি অমানবিক দেখালেও একজন বৃদ্ধ মানুষের পক্ষে মানসিক প্রতিবন্ধী বৃষ্টিকে দেখভাল করা অসম্ভব। চিকিৎসা করালে মেয়েটি হয়তো ভালো হতে পারে। কিন্তু তাদের সামর্থ্য নেই। রাহেলা বেগমের ছেলেরা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। সুখজান ও রাহেলা বেগমের জন্য সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। এ ব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সরকার অসীম কুমার বলেন, ‘১০ বছর ধরে মেয়েটি শেকলে বাঁধা অবস্থায় রয়েছে, এটা খুবই দুঃখজনক। আমি খোঁজ নিয়ে অবশ্যই তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করব এবং পরিবারটির পাশে দাঁড়াব।’





