গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বাগদাফার্ম এলাকার প্রায় দুই হাজার ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়াসহ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ৬ দিন আগের এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত স্থানীয় থানায় মামলা হয়নি। এমনকি কারা আগুন দিল, কীভাবে লুটপাট চালানো হলো তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি।

সাঁওতাল অধ্যুষিত দু’টি গ্রাম উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর ও জয়পুর। গত রোববার সারাদিন ছিল ওই দুই গ্রামের মানুষের জন্য বিভীষিকাময়। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে ফিরছে গ্রামের বাসিন্দাদের।

শনিবার সকালে সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে দেখা যায় নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারি এলাকার পরিবেশ। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন মাদারপুর গ্রামের সাঁওতায় সম্প্রদায়ের মুংলু হেমব্রম (৫৫)। তিনি ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললেন, তাঁদের কাছে খাবার নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। খোলা আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করতে হচ্ছে।  

মুংলু হেমব্রম আরো বলেন, গত রোববার আগুন দিয়ে তার সবকিছু পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

একই গ্রামের আব্দুল রাজ্জাকের স্ত্রী ফুলমতি বলেন, চিনিকলের জায়গায় তৈরি করা প্রায় ২০০০ ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন তারা নিঃস্ব।

এলিয়া মুরমু (৪৫) নামের আরেকজন বলেন, ঘরে আগুন দেওয়ার কথা মনে হলে এখনও বুক কেঁপে ওঠে। একই রকমের অনুভূতি জানান আরও কয়েকজন।

এদিকে, এসব এলাকায় ইতোমধ্যে শীত পড়েছে। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার কারণে খোলা আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করতে হচ্ছে নিঃস্ব মানুষগুলোকে। বিশেষ করে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং শিশুরা চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এর মধ্যে অর্থকষ্ট তাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত করে দিয়েছে।

সাপমারা ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ গ্রামের হাতেম আলীর স্ত্রী জোবেদা বেগম (৭০) জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী বৃদ্ধ, চলাফেরা করতে পারেনা। জমি-জমা কিছুই নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে নিয়েছিলেন চিনিকলের জমিতে। সেখানে অনেক কষ্টে দু’টি একচালা ঘর তুলে জীবন যাপন করছিলেন। কিন্তু সেই ঘর ভাংচুর করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি হাঁস-মুরগী থেকে শুরু করে গরু-ছাগল পর্যন্ত লুট করা হয়েছে।

সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ইক্ষু খামার জমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন, সাঁওতালদের বাড়িঘরে হামলার ৬ দিন পার হচ্ছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। সাঁওতালরা ‘পুলিশের ভয়ে’ মামলা করছে না।

সাঁওতালরা মামলা না করলেও সংঘর্ষের ঘটনায় গোবিন্দগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কল্যাণ চক্রবর্তী বাদী হয়ে ঘটনার রাতে ৪২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০ থেকে ৪০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি দেখিয়ে মামলা করেছেন। ওই মামলায় এ পর্যন্ত পর্যন্ত  চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাঁওতালদের আতঙ্ক কাটাতে নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি সুব্রত কুমার সরকার  বলেন, সাহেবগঞ্জ এলাকার পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। সেখানে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া শান্তি রক্ষায় সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামার কার্যালয়ে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না- তা জানা নেই। তবে তিনি সাঁওতালদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল হান্নান জানান, উপজেলার বাগদাফার্ম এলাকায় সাঁওতাল পল্লীতে ‘উচ্ছেদ’ অভিযান হয়নি। তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বলেন, এটা উচ্চ মহলের ব্যাপার।

এদিকে, রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে শুক্রবার দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনা পরিদর্শনে আগামীকাল রোববার সেখানে যাচ্ছেন ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। এ ঘটনায় কারো দায় পাওয়া গেলে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
এআই