কৃষি গবেষণায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান এর আর্ন্তজাতিক পুরষ্কার অর্জন

 

কৃষিবার্তা ডেস্কঃ কৃষি ও জীববিজ্ঞান গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালেয় কৃষিতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান দি ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সাইন্সেস এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সাইন্স ইয়াং সাইন্টিস্ট এওয়ার্ড ২০১৪ এর জন্য চুড়ান্তভাবে মনোনীত হয়েছেন। ইতালী ভিত্তিক বিজ্ঞান সংস্থা দি ওয়ার্ল্ড একাডেমী অব সাইন্সেস (ঞডঅঝ) এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী (ইঅঝ) যৌথভাবে তার পুরষ্কার লাভের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। অচিরেই উপরোক্ত সংস্থা দু’টি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান কে একটি স্বর্ণপদক, দু’টি সংস্থার পক্ষ থেকে আলাদাভাবে সার্টিফিকেট এবং প্রাইজ মানি প্রদান করবে। তার এই অনন্য অর্জনের জন্য শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর শাদাত উল্লা, প্রোভিসি, ট্রেজারারসহ সকলেই তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।

 

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান ফসল উদ্ভিদের উপর পরিবেশগত প্রতিকূলতার প্রভাব এবং এগুলো নিরাময়ের উপায় নিয়ে নিরলস গবেষণা করছেন। তিনি লবণাক্ততা, খরা, বিষাক্ত ধাতব পদার্থ, উচ্চ তাপমাত্রা পীড়িত উদ্ভিদে নাইট্রিক অক্সাইড ও সেলেনিয়াম প্রয়োগে সফলতা পান এবং পর্যবেক্ষণে দেখেন যে এক্ষেত্রে অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের পরিমাণ ২৫-৩৫ শতাংশ হ্রাস পায়। তার গবেষণার ফলাফলসমূহের ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা পরিবেশগত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে উচ্চ ফলনশীল ও উপযুক্ত জাত উদ্ভাবনে কাজ করছেন। তার গবেষণার ফলাফলসমূহ ঊষংবারবৎ, ঝঢ়ৎরহমবৎ, ডরষষবু, ঞধুষড়ৎ ধহফ ঋৎধহপরং সহ বিশ্বের খ্যতনামা জার্নালসমূহে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও তার গবেষনালব্ধ লেখা ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে প্রকাশিত প্রায় দশটি খ্যাতনামা বইয়ে স্থান পেয়েছে। তিনি তার গবেষণার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী, থাইল্যান্ড, অষ্ট্রিয়াসহ কয়েকটি দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে উপস্থাপন করেছেন। তিনি ১২টি আন্তর্জাতিক জার্নালের এডিটোরিয়াল বোর্ডের সদস্য এবং ৩০ টি আন্তর্জাতিক জার্নালের রিভিউয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ড. হাছানুজ্জামান প্রায় ৩৫ টি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থার সদস্য। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) ন্যাশনাল কনসালটেন্ট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

 

ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান ২০১২ সালে ‘দি ইউনাইটেড গ্রাজুয়েট স্কুল অব এগ্রিকালচারাল সাইন্স, এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান’ থেকে জাপান সরকার প্রদত্ত্ব ‘মনবুকাগাকশু’ স্কলারশিপের অধীনে প্ল্যান্ট ফিজিওলজি এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট মেটাবলিজমের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার পিএইচডি গবেষণার ফলাফলসমূহ প্রভাবশালী জার্নাল ‘এনভায়ারনমেন্টাল এন্ড এক্সপেরিমেন্টাল বোটানী, ‘বায়োলজিয়া প্ল্যানটারাম’, ‘ইকোটক্সিকোলজী’, ‘বায়োলোজিক্যাল স্ট্রেস এলিমেন্ট রিসার্চ’, ‘প্লান্ট বায়োটেকনোলজি রিপোর্ট’, ‘অস্ট্রেলিয়ান জার্নাল অব ক্রপ সাইন্স’ এ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্য, তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা থেকে বিএসসি এজি (অনার্স) এবং এমএস (কৃষিতত্ত্ব) ডিগ্রী লাভ করেন এবং উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেনীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান জানান, আগামী দিনে বাংলদেশে জলবায়ুগত পরিবর্তন ও পরিবেশগত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে উপযুক্ত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণা আরো জোরদার করা উচিৎ।

ড. হাছানুজ্জামান গবেষণা করতে গিয়ে গম ও সরিষা উদ্ভিদে উচ্চমাত্রার অক্সিডেটিভ স্ট্রেস লক্ষ্য করেন। তিনি এসব ক্ষেত্রে নাইট্রিক অক্সাইড ও সেলিনিয়াম প্রয়োগে আশাতীত সফলতা পান। তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, প্রতিকূল অবস্থায় স্বল্প মাত্রায় নাইট্রিক অক্সাইড প্রয়োগ গাছকে এক বিশেষ ধরনের সংকেত দেয় যা এন্টিঅক্সিডেন্ট ডিফেন্স সিস্টেমকে সক্রিয় করে স্ট্রেস হ্রাস করে। শিল্পায়ন, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলবায়ুগত পরিবর্তনসহ নানাবিধ কারনে কৃষি জমির মাটি বিভিন্ন হেভি মেটাল- আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড প্রভৃতি দ্বারা দূষিত হচ্ছে। যা একদিকে ফসলের পুষ্টি উপাদান গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে অন্যদিকে এসব হেভি মেটাল মাটি থেকে ফসলের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে। যা মানুষের ক্যন্সার সহ নানাবিধ জঠিল রোগের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। তাই ফসলে এসব হেভি মেটালের উপস্থিতি দুর করতে প্রয়োজন মৌলিক গবেষণা। জলবায়ুগত প্রতিকুলতাকে মোকাবেলা জয়ের জন্য টেকসই নতুন জাত উদ্ভাবনের কোন বিকল্প নেই। স্ট্রেস প্রতিরোধী ফসল জাত উদ্ভাবনে ড. মীজা হাছানুজ্জামান এর গবেষণা বেশ কার্যকর বলে গবেষকরা মনে করেন।

উল্লেখ্য যে, ড. মীর্জা হাছানুজ্জামান ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার বাড়ীখলা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা মিজানুর রহমান বিজিবিতে কর্মরত ছিলেন এবং মাতা হালিমা খাতুন অতিসম্প্রতি পরলোকগমন করেছেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং এক পুত্র সন্তানের জনক। তার সহধর্মীনি কামরুন্নাহার নিঝুম একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচারাল বোটানী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং বর্তমানে জাপানে পিএইচডি অধ্যয়নরত।