নড়াইলে সপ্তাহব্যাপী সুলতান মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ সুলতান মঞ্চ চত্বরে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি বলেন, চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান শুধু নড়াইলের গর্ব নয়, তিনি বাংলাদেশের গর্ব। শিল্পী সুলতানের সুনাম বিশ্বব্যাপি। তিনি মাটি ও মেহনতি মানুষের ছবি এঁকেছেন। শিল্পী সুলতানের স্মৃতিকে ধরে রাখতে শিল্পী সুলতানের নামে প্রতিষ্ঠিত আর্ট কলেজটি যাতে জাতীয়করণ করা হয় অথবা শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা করা হবে জানান।
অনুষ্ঠানে এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোঃ মাহমুদ শরীফের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ হাফিজুর রহমান, নড়াইল জেলা পরিষদের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাস,পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম, নড়াইল পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর বিশ্বাস, জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন খান নিলু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের ৯২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এসএম সুলতান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকায় সপ্তাহব্যাপী মেলা গত ১৫ জানুয়ারী থেকে শুরু হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়েছে রবিবার । মেলা চলবে আগামী ২১ জানুয়ারী পর্যন্ত। উদ্বোধনী দিনে সন্ধ্যায় সেমিনারে নড়াইলের কৃতি সন্তান উপন্যাসিক নিহার রঞ্জন গুপ্তের জীবন ও কর্মের ওপর সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
অ্যাডভোকেট হেমায়েত উল্লাহ হিরুর সভাপতিত্বে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রধান আলোচক ছিলেন এস এম সুলতান বেঙ্গল আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর অশোক কুমার শীল প্রমুখ।
মেলার সময় সূচি:
১৭ জানুয়ারি (মঙ্গলবার): গ্রামীন ক্রীড়া উৎসব, সেমিনার কবিয়াল বিজয় সরকার ও জারী সম্্রাট মোসলেম উদ্দিনঃ জীবন ও কর্ম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ১৮ জানুয়ারি (বুধবার) : সেমিনার বীরশ্রেষ্ট নুর মোহাম্মদ শেখঃজীবন ও কর্ম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ১৯ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার): চারুশিল্পী সম্মাননা প্রদান, সেমিনার সুরকার কমল দাসগুপ্তঃ জীবন ও কর্ম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ২০ জানুয়ারি (শুক্রবার): গ্রামীন ক্রীড়া উৎসবের সমাপনী, সেমিনার শিল্পী এস এম সুলতানঃ জীবন ও কর্ম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
২১ জানুয়ারি (শনিবার): সুলতান পদক প্রদান ও সমাপনী দিনে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী শ্রী বিরেন শিকদার এমপি। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোঃ হেলাল মাহমুদ শরীফ। মেলায় প্রতিদিনই থাকছে গ্রামীণ খেলাধুলা, শিল্পী এসএম সুলতানসহ নড়াইলের বিভিন্ন গুনী শিল্পীদের জীবন ও কর্মের ওপর সেমিনার, স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মেলা প্রাঙ্গনে শতাধিক স্টলে নানা ধরনের পন্য নিয়ে বসেছেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দোকানীরা। মেলাকে ঘিরে নড়াইলে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।র গভীরতম অন্তরভূমিতে যে অমিত শক্তি সুুপ্ত ছিল সহস্র বছর ধরে তারই নান্দনিক শৈল্পিক প্রকাশের অন্যতম সূর্যসারথি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান।
১৯২৪ সালের ১০ আগষ্ট তৎকালিন মহকুমা শহর নড়াইলের চিত্রা নদীর পাশে সবুজ শ্যামল ছায়া ঘেরা, পাখির কলকাকলীতে ভরা মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন শিল্পী এস এম সুলতান। তার পিতা মোঃ মেছের আলি মাতা মোছাঃ মাজু বিবি। চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে পিতা মাতা আদর করে নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া।
চিত্রশিল্পী এস, এম, সুলতানের ৭০ বছরের বোহেমিয়ান জীবনে তিনি তুলির আঁচড়ে দেশ, মাটি, মাটির গন্ধ আর ঘামে ভেজা মেহনতী মানুষের সাথে নিজেকে একাকার করে সৃষ্টি করেছেন “পাট কাটা”, “ধানকাটা”, “ ধান ঝাড়া”, “ জলকে চলা”, “ চর দখল”, “গ্রামের খাল”, “মৎস শিকার”, “গ্রামের দুপুর”, “নদী পারা পার”, “ধান মাড়াই”, “জমি কর্ষনে যাত্রা”, “মাছ ধরা”, “নদীর ঘাটে”, “ধান ভানা”, “গুন টানা”, “ফসল কাটার ক্ষনে” , “শরতের গ্রামীন জীবন”, “শাপলা তোলা” মত বিখ্যাত সব ছবি।
১৯৫০ সালে ইউরোপ সফরের সময় যৌথ প্রদর্শনীতে তার ছবি সমকালনী বিশ্ববিখ্যাত চিত্র শিল্পী পাবলো পিকাসো, ডুফি,সালভেদর দালি, পলক্লী, কনেট, মাতিসের ছবির সঙ্গে প্রদর্শিত হয়। সুলতানই একমাত্র এশিয়ান শিল্পী যার ছবি এসব শিল্পীদের ছবির সঙ্গে একত্রে প্রদর্শিত হয়েছে। কালোর্ত্তীন এই চিত্রশিল্পী ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্স আটির্ষ্ট হিসেবে স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে রাষ্টীয় ভাবে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিল্পী সুলতান মৃত্যুবরণ করেন।
রায়/নাজিব





