মধ্যরাতে খুন করে সকালে পরিপাটি হয়ে হোটেল ছেড়েছে তারা। খুন হওয়া ব্যক্তির প্রাইভেট কার চালিয়ে বিনা বাধায় হোটেল ছাড়ে। গোল বাধে গাড়ির তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে। সন্দেহভাজন খুনি চালাচ্ছিল গাড়ি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হোটেল থেকে বের হয়ে পুরাতন বাসস্টেশনের পেট্রল পাম্পে যাওয়ার পথে অন্তত তিনবার আঘাত লাগে। কখনো সড়কের পাশের ফুটপাত, কখনো বাতির পোস্টে আঘাত করে গাড়িটি। প্রথমে শেভরন ক্লিনিকের সামনে, পরে বনরূপা চত্বরে এবং সর্বশেষ পুরাতন বাসস্টেশন এলাকায় গাড়িটি বিভিন্ন স্থাপনায় আঘাত করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

খবর পেয়ে গাড়িটি আটক করেন ট্রাফিক পরিদর্শক নীতি বিকাশ দত্ত। আটক করে গাড়িটি থানায় নিয়ে গেলেও সেখানে জনৈক সেনা কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে ঠিকই বের হয়ে গিয়েছিল কৌশলে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস। এরই মধ্যে হোটেল থেকে অভিযোগ করা হয় থানায়। চলে যাওয়ার জন্য থানার গেটের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া তিনজনকে তাৎক্ষণিক থামান কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ রশীদ; মুহূর্তে বদলে যায় দৃশ্যপট। মোটেল থেকে আসেন কর্মচারীরা। তারা শনাক্ত করেন, গাড়ি দুর্ঘটনায় জড়িত এই তিনজন তাদের সঙ্গে আসা আরেকজনকে রাতে খুন করেছে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের আটক করে পুলিশ।

আটকের পর সন্দেহভাজন খুনি শাওন পুলিশকে বলে, 'গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না। ব্রেক চাপলেও তা কাজ করছিল না। অ্যাঙ্লিারেটর চাপলেও গাড়ি ধাক্কা দিচ্ছিল। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে।'

হোটেলে ছিলেন স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে

গত ১৩ আগস্ট রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে দুই জোড়া তরুণ-তরুণী স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে শহরের প্রবেশপথের মোটেল জর্জে ওঠে। হোটেলের ভিআইপি কক্ষ ৯ ও ১০-এ প্রকৃত নাম গোপন করে কাশেম ও নিপা, অপু ও পদ্ম নামে ওঠে। রাতে হোটেল কর্মচারীরা তাদের কক্ষে তুলে দিয়ে চলে যান। সকাল পৌনে ১০টার দিকে কক্ষ থেকে বের হয়ে হোটেল ছাড়ে দুই তরুণী ও এক তরুণ। তারা বের হয়ে যাওয়ার পর হোটেলের কর্মচারী কক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে দেখেন বিছানায় চাদর নেই। কর্মচারী রাজু বাথরুমে উঁকি দিয়ে দেখেন, চাদর মোড়ানো রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হোটেল ব্যবস্থাপক থানায় অবহিত করলে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। উদ্ধার করা লাশটি চট্টগ্রামের হালিশহর গ্রিন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী সাইদুল আলম লিটুর (৩২)।

প্রকৃত পরিচয়

পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর জিজ্ঞাসাবাদে যুবক আমজাদ হোসেন শাওন (২৭) জানায়, তার সঙ্গে আটক হওয়া দুজন হলো তার স্ত্রী ছায়েরা হক মৌ (২০) ও শ্যালিকা ফারিয়া হক পদ্ম (১৭)। নিহত লিটু তার ব্যবসায়িক অংশীদার। তার দুটি মোটরসাইকেল লোপাট করেছেন লিটু। তাই তাকে কৌশলে রাঙামাটি এনে খুন করেছে। হত্যার সঙ্গে তার স্ত্রী ও শ্যালিকা জড়িত নয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নেপাল চন্দ্র সরকার বলেন, 'শাওনকে শনিবার রাঙামাটির চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে গিয়ে দেখা যায়, দুই বোন মৌ ও ফারিয়া একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। অন্যদিকে শাওন নির্বাক বসে আছেন।'

লিটু কে?

চট্টগ্রাম শহরের হালিশহরের গ্রিন আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের ৪০ নম্বর বাসার বাসিন্দা সাইদুল আলম লিটু। পেশায় গার্মেন্ট ও শেয়ার ব্যবসায়ী। আগের স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আট মাস আগে আরেকটি বিয়ে করেন। তার আগের ঘরে চার বছর বয়সী এক শিশু সন্তানও আছে। তিনি শ্বশুর জহির আহম্মেদের চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাট এলাকার টিশান গার্মেন্টে নিয়মিত বসতেন। সেখানকার ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। লিটুর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ।

লিটুর বড় ভাই ও বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ লিপটন জানান, তিনি শাওন কিংবা তার স্ত্রীকে কখনো দেখেননি। তার ভাইয়ের এ রকম কোনো অংশীদারের কথা জানেন না। তিনি দাবি করেন, 'এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো মোটিভ আছে এবং ভাইকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।'

শনিবার লিটুর লাশ পোস্টমর্টেম শেষে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার আগে বড় ভাই লিপটন রাঙামাটির কোতোয়ালি থানায় আটক তিনজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

লিটুর নতুন স্ত্রী বাবার বাড়িতে থাকেন জানিয়ে লিপটন বলেন, 'বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লিটু গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার সময় আমরা ভেবেছিলাম সে হয়তো শ্বশুরবাড়িতেই যাচ্ছে। কিন্তু এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে পারে কল্পনাই করতে পারিনি।'

সংশ্লিষ্টরা কী বলেন?

মোটেল জর্জের ব্যবস্থাপক কামাল হোসেন খান বলেন, 'সকাল পৌনে ১০টার দিকে তারা হোটেল থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় চাবি দিয়ে গেলে আমি রুমবয় রাজুকে পাঠাই। সে রুম থেকে এসে জানায়, বাথরুমে রক্তাক্ত কিছু একটা চাদর মোড়ানো আছে। আমি যাওয়ার পর বিষয়টি দেখে থানায় খবর দিই।'

সহকারী পুলিশ সুপার চিত্তরঞ্জন পাল বলেন, 'তাদের পোশাক-আশাক এবং চেহারা এতটা ফ্রেশ ছিল যে বোঝার উপায় ছিল না তারা কাউকে খুন করেছে। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।'

তিন মাসে হোটেলে দ্বিতীয় খুন

এর আগে গত ১৪ মে রাঙামাটির শহরের রিজার্ভবাজারের হোটেল লেকসিটিতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওঠার পর আসমা (৩৪) নামের এক নারীকে খুন করে পালিয়ে যায় সঙ্গী পুরুষ। সেই ঘটনার এখনো তদন্ত চলছে। আসামিকে গত তিন মাসেও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে ঠিক তিন মাসের মাথায় একই তারিখে খুন হলো আরেকজন। বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন পর্যটন ও হোটেল ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা।

ইআর