নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থায় শেষ হলো ১০দিনব্যাপী ‘সুলতান মেলা’। সুলতান মেলার দাওয়াতপত্র অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (৪ডিসেম্বর) বিকেল ৩টায় সমাপনী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সন্ধ্যা পর্যন্ত অতিথি আসনগুলো শূণ্য ছিল।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার সন্ধ্যা ৬টা ২১ মিনিটে মেলা চত্বরে আসেন। প্রায় ৭টা পর্যন্ত চলে অতিথি বরণপর্ব। এতে মেলায় আগত সুলতান ভক্ত ও দর্শকেরা অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহ নিয়েও বিপাকে পড়েন।
সাংবাদিকদের জন্য মেলা প্রাঙ্গনে বসার তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। জেলায় ৫০জনের বেশি পেশাদার সাংবাদিক থাকলেও সুলতান মেলা কর্তৃপক্ষ সাংবাদিকদের জন্য ছোট একটি টেবিল ও দু’টি চেয়ারের ব্যবস্থা রাখেন বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
মেলা কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মন্ত্রী দুপুর থেকেই নড়াইলে অবস্থান করছিলেন। তবুও নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়নি। বিকাল ৩ টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা থাকলেও শুরু হয় রাত ৭টার দিকে। এ ব্যাপারে সুলতান ভক্তসহ মেলায় আগত দর্শকেরা ফেসবুকে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে নড়াইলের সুলতান মঞ্চে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. বীরেন শিকদার ‘সুলতান পদক’ প্রদান করেন। এ বছর ‘সুলতান স্বর্ণ পদক’ পেয়েছেন ভাস্কর শিল্পী ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী। তবে শিল্পী প্রিয়ভাষিণী অসুস্থ থাকায় তিনি আসতে পারেননি। তার পক্ষে পদক গ্রহণ করেন শিল্পীর ভাই সৈয়দ হাসান শিবলী।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক এমদাদুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন বিশ্বাস, পুলিশ সুপার সরদার রকিবুল ইসলাম (অতিরিক্ত ডিআইজি), সুলতান ফাউন্ডেশনের সদস্য সচিব আশিকুর রহমান মিকু, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবাস চন্দ্র বোস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক ড. সুশান্ত অধিকারী প্রমুখ।
অপরদিকে দর্শকেরা জানান, এবার মেলায় তেমন কোনো গ্রামীণ খেলা এবং ভালো কোনো অনুষ্ঠান ছিল না। নাম সর্বস্ব মেলা হয়েছে। এমন মেলা চায় না দর্শকেরা। নড়াইল জেলা ক্রীড়া সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, সুলতানের জীবন আদর্শ নিয়েই মেলা করা উচিৎ। তিনি গ্রামীণ জীবন যাত্রা পছন্দ করতেন। এ মেলায় তার কোন প্রতিফলন ঘটেনি।
সুলতানের ভক্ত শিল্পী বাবলু জানান, সুলতানকে নিয়ে কিছু লোক উপহাস করছে। তার ভক্ত শিষ্যদের বাদ দিয়ে কিছুলোক মেলার নামে ব্যবসা শুরু করেছে। সুলতানের কোন জীবনদর্শন নেই এ মেলায়। সেকারণে এ মেলায় দর্শক টানতে পারেনি।
সুলতানের শিষ্য শিল্পী সাকী জানান, শিল্পীর উত্তরসূরীদের মূল্যায়ন না করলে এ মেলা চলবে না। সুলতানের চিন্তা চেতনা বাস্তবায়ন করতে হলে তাঁর অনুসারীদের মতামতের মূল্যায়ন করতে হবে।
সুলতানের আরেক ভক্ত বলেন, স্পন্সর কোম্পানীর নিকট হতে মোটা অংকের টাকা নিয়ে, স্টল বরাদ্দ দিয়ে উচ্চহারে টাকা তুলে আপ্যায়ন ও সাজ সজ্জায় খরচ দেখিয়ে শুধু ভাইচার করা হয়েছে। মেলার নামে কিছু লোকের স্বার্থ সুবিধা রক্ষা হয়েছে। এতে নাখোশ সুলতান ভক্ত,শিষ্য ও তার অনুসারিরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১০ দিনের এ মেলা চলাকালিন সময়ে ৬ হাত জায়গার স্টলের জন্য ১৫ হাজার করে টাকা নেয়া হয়েছে। উচ্চহারে টাকা নিয়ে স্টল বরাদ্দ দেয়ায় স্টল মালিকরা মালের দাম বাড়িয়ে দেন। সেকারনে তাদের মালামাল তেমন বিক্রি হয়নি। এতে স্টল মালিকরা চরম ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক স্টল মালিক। প্রতি বছরই এ মেলায় মোটা অংকের টাকা ব্যয় দেখানো হয়। আপ্যায়ন ও সাজ সজ্জায় আশ্চর্ষ্যজনক বিল করা হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয় সূধি সমাজের অভিযোগ প্রশাসন ও তাদের ঘনিষ্টরা ছাড়া আর কাউকেই আপ্যায়ন তো দূরের কথা বসতেও বলা হয় না। সে ব্যক্তি যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, প্রশাসনের অনুগত না হলে কোন মূল্যায়ন করা হয় না।
সুলতান ভক্তদের দাবি মেলাকে আগ্রাসন মুক্ত করতে হবে। এ মেলা নড়াইলবাসির প্রাণের মেলা। এ মেলার প্রাণ ফিরিয়ে আনতে স্টল বরাদ্দ ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। সুলতানের ভক্ত, শিষ্য ও উত্তরসূরীদের মূল্যায়ন করতে হবে। স্থানীয় শিল্পীদের গুরুত্ব দিতে হবে।
নড়াইল জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি হুমায়ুন কবীর রিন্টু বলেন, সাংবাদিকরা এ মেলার প্রচার করে থাকে কিন্তু তাদের জন্য অন্ততঃ বসার সু-ব্যবস্থা না থাকাটা খুবই দুঃখজনক। তাছাড়া সাংবাদিকরাতো এ সমাজেরই মানুষ। তারাও এ মেলার শুভাকাংখি ও সহযোগি।
গত ২৬ ডিসেম্বর বিকেলে নড়াইলের সুলতান মঞ্চ চত্বরে বেলুন উড়িয়ে মেলার উদ্বোধন করেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া। বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৯৩তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও মৌসুমী ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির পৃষ্ঠপোষকতায় এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ আগস্ট শিল্পীর জন্মদিন হলেও শোকের মাস এবং বর্ষার কারণে ২০০৩ সাল থেকে শীতকালে ‘সুলতান মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
এসএম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়ায় বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। অসুস্থ অবস্থায় ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
রিন্টু/জারিফ





