চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে সরকার ব্যাংক থেকে কোন ঋণ গ্রহণ করেনি। বরং ৩ হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ করেছে। তবে জাতীয় সঞ্চয় প্রকল্প খাত হতে নিট ১০ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।

যেখান থেকে মোট ৮ হাজার ৭০১ কোটি টাকা প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের দায় পরিশোধিত হয়েছে। ফলে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস হতে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা।

রোববার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাজেটের অগ্রগতি ও আয়-ব্যয় সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেন। বাজেট ২০১৬-১৭ : প্রথম প্রান্তিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও আয়-ব্যয়ের গতিধারা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন শীর্ষক সরকারি দলিল সংসদে উপস্থাপন করেন তিনি।

সার্বিকভাবে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা বেশ সন্তোষজনক বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে মুদ্রা ও ঋণ পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের হার কমায় বাজারে সুদের হারের নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, ব্যক্তি খাতে অর্থনৈতিক কর্মতৎপরতা উজ্জীবিত হওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।

তিনি আরও জানান, বিগত অর্থবছর ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি (২০১৬-১৭) অর্থবছরের প্রান্তিক বাজেট বাস্তবায়নের চিত্রে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে রেমিট্যান্স। গত অর্থবছরের প্রান্তিক বাজেটের তুলনায় এবারের খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

অন্যদিকে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে, যার পরিমাণ ৭০ কোটি ১৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার।

এদিকে জনজীবনে স্বস্তি বজায় রাখতে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে রেখেছি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাওয়ায় সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি সেপ্টেম্বর ২০১৫ সময়ের ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ হতে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সময়ে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। সন্তোষজনক কৃষি উৎপাদন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের স্থিতিশীল মূল্য, অনুকূল মুদ্রা সরবরাহ পরিস্থিতি এবং সর্বোপরি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকবে বিধায় সামনের দিনেও মূল্যস্ফীতি বাড়বে না বলে জানান অর্থমন্ত্রী।

বৈদেশিক খাতে রফতানি পরিস্থিতি বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ১২ শতাংশ বেশি। আমদানি ব্যয় হয়েছে ১১ হাজার ১০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ২৭ শতাংশ বেশি।

রেমিট্যান্সের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ ছিল ৩ হাজার ২৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৩১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার, যা দিয়ে ৮ দশমিক ৪ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব।

রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রার এক-পঞ্চমাংশের চেয়ে কম অর্জিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এ সময়ে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৪৩ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা, যা বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছর বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক সূত্র হতে জিডিপির ১ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র হতে জিডিপির ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ সংস্থানের পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া জিডিপির শতাংশ হিসাবে সরকারি ঋণের স্থিতি ৩৫ শতাংশ, যা অত্যন্ত সহনীয় বলে উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় বলেন, প্রথম প্রান্তিকে মোট ব্যয় হয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা, যা বাজেটের ১২ দশমিক ৫৯শতাংশ। এর মধ্যে অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ৩৫ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা, যা বাজেটের প্রায় ১৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় মোট ব্যয় বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ, অনুন্নয়নসহ অন্যান্য ব্যয় ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ব্যয় দশমিক ৪২ শতাংশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছে ৭ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকার। বিগত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৭ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে বৃহৎ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পরিবীক্ষণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষে মুদ্রার প্রবৃদ্ধি ছিল (১৬ দশমিক ৪ শতাংশ ), যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কিছুটা বেশি। এসময় নিট বৈদেশিক সম্পদ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেলেও নিট অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল। মূলত সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে অব্যাহত উদ্বৃত্ত ও সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাসের কারণে এটি হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় উল্লেখ করেন।

মাহমুদ