বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় না।

আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের সময়ে আবারও তার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন তারা।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন৷ দেশের বাইরে থাকা অবস্থায় ওই বছর তার অনুপস্থিতিতে তাঁকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়৷ ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে তিনি ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন।-ডয়েচ ভেলে

আর খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারপার্সন ১৯৮৪ সাল থেকে৷ ১৯৮৪ সালের ১২ জানুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপার্সন এবং একই বছরের ১০ মে চেয়াপার্সন হন৷ তিনি কারাগারে থাকায় লন্ডনে অবস্থানরত তার বড় ছেলে তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন৷ আর এরশাদ আমৃত্যু জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ছিলেন ।

এবারের কাউন্সিলেও শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি হচ্ছেন৷ কিন্তু সাধারণ সম্পাদক কে হবেন তা-ও নির্ধারণ করবেন শেখ হাসিনা৷ দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গত কয়েক মাস ধরে তার সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা-না-থাকা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ঘুরেফিরে অনেক কথা বললেও শেষ পর্যন্ত একটি কথাই বলেছেন, ‘‘সাধারণ সম্পাদক কে হবেন সেব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত৷''

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, সারাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের ১৫ হাজার কাউন্সিলর নেতৃত্ব নির্বাচন করতে কাউন্সিলে যোগ দিয়েছেন৷ এজন্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুনকে প্রধান করে নির্বাচন কমিশনও গঠন করা হয়েছে৷ আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কোনো প্রার্থী নেই৷ ফলে তিনিই সভাপতি থাকছেন৷ আর প্রচলিত ধারায় কাউন্সিলররা সাধারণ সম্পাদকসহ পরবর্তী নেতৃত্ব নির্বাচন করার জন্য শেখ হাসিনাকেই (সভাপতি) সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেন৷ এবারও তার ব্যতিক্রম আশা করছেন না কেউ৷ ফলে সভাপতিই পরবর্তী নেতৃত্ব ঠিক করবেন ।

২০১৬ সালে বিএনপির সর্বশেষ কাউন্সিলেও খালেদা জিয়া চেয়ারপার্সন পদে একক প্রার্থী ছিলেন। আর মহাসচিবসহ অন্যান্য নেতৃত্বও তার ইচ্ছা অনুযায়ী নির্বাচন করা হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের এই পরিস্থিতি কেন? এর জবাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘‘ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে সবল দল হলো আওয়ামী লীগ। সেই আওয়ামী লীগের ভিতরেই নেতা-নেত্রীরা বলবেন, সবকিছু জানেন প্রধানমন্ত্রী৷ প্রধানমন্ত্রী আমাদের দেশে সবচেয়ে সবল প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দলের ভিতরে দ্বিতীয় কেউ নাই, যে বলতে পারেন, হ্যাঁ, আমি দ্বিতীয়। আর সবাই দুর্বল। শেখ সাহেবের কাছাকাছি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছাকাছি কেউ আছে এটা তো খুঁজে পাওয়া যায় না।

তার মতে, ‘‘দলের নেতারাও দলের ভেতরে গণতন্ত্র চান না, কারণ, তারা চান কানেকশন। তারা যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের অবস্থান সংহত করতে চান। কারণ, এখানে মেধার ভিত্তিতে কিছু হয় না, হয় যোগাযোগের ভিত্তিতে।

আর বিএনপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের চেয়ে সম্ভবত বিএনপির অবস্থা আরো খারাপ।

এদিকে নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন আরেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। কিন্তু উপমহাদেশে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতসহ আরো কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে গুরুত্ব দেয়া হয় বলে জানান তিনি। তিনি মনে করেন, এর ভালো-খারাপ দুই দিকই আছে। খারাপ দিক হলো, নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে না। তবে অনেক সময় ভুল নেতৃত্ব নির্বাচনের আশঙ্কা থেকে রেহাই পাওয় যায়।

অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, ‘‘মাঝেমধ্যে সংকটের সময় এই প্রবণতা ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব আনার চেষ্টা হয়েছে৷ কিন্তু সফল হয়নি৷ দেখা গেছে আর পুরনো নেতৃত্বের ওপরই নির্ভর করা হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

তার মতে, এটা যে শুধু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রবণতা, তা নয়। এনজিও, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম সবখানেই এক ব্যক্তিনির্ভরতার প্রবণতা। এটা একটা সামগ্রিক সংকট।

তবে গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে তার অভিমত।

আর আফসান চৌধুরীর মতে, ‘‘দলের নেতাদের দলের মধ্যে গণতন্ত্র চাইতে হবে। যারা ধনী,তারা রাজনীতি করেন।তারা এটা চান তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য।''

এই অবস্থা যে শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেই, তা নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর জেলা ও উপজেলা থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্ব নির্বাচন হয় সিলেকশন পদ্ধতিতে, হয় কেন্দ্রের ইচ্ছায়।

এএস