রাজধানীর দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম ধানমন্ডি লেক। এই লেকটি বিনোদন, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম একটি মাধ্যম হিসেবে গড়ে উঠেছে। ঢাকার প্রথম সরকারিভাবে সাজানো লেকও এটি। ১৯৯৫ সালে সংস্কার করে লেকটিকে নতুন রূপ দেয়া হয়। বিকালে সময় কাটানোর জন্য বেশ জনপ্রিয় ধানমন্ডি লেক। এবারের ঈদে ধানমন্ডি লেক হতে পারে বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র।

সর্পিল ধারায় বয়ে চলা এই লেকটি ঘিরেই তৈরি হয়েছে পায়ে হেঁটে চলার পথ। যেখানে প্রতিদিনই দেখা মেলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষদের। আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করা রবীন্দ্র সরোবর যা সংস্কৃতি প্রেমিকদের মুল আকর্ষণ হিসেবে বিবেচ্য।

সেই সাথে আছে মাছ ধরা, নৌকা ভ্রমন করার ব্যবস্থাও। মোট কথা গ্রামীণ জীবনের স্বাদ পাওয়া যাবে এই লেকের ধারে আসলে। আরও আছে খাদ্যপ্রেমীদের জন্য নানা রকম খাবারের আয়োজনও।

প্রতিদিনি অসংখ্য মানুষের দেখা মেলে লেকের পাড়ে, তারা আসেন আড্ডা দিতে। লেকের পাড়ে আছে বেশ কয়েকটি বসার স্থান আছে। এখানে বসে খোলা হাওয়ায় পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডায় মেতে উঠতে দেখা যায় নগর জীবনে ব্যস্ত নানান রকমের মানুষদের।

ধানমন্ডি লেকের ইতিহাস

আজকের এই আবাসিক এলাকা ধানমন্ডিতে ব্রিটিশ আমলে চাষাবাদ হতো। তবে সেইসময় ধানমন্ডিতে কিছু কিছু বসতিও ছিল তবে পরিমাণে খুবই সামান্য। সেই সময় ধান উৎপন্ন হতো বলেই কিন্তু এর নামকরণ ধানমন্ডি হয় নি। এলাকাটিতে ধানের এবং অন্যান্য শস্যের বীজের হাট বসতো। হাট বাজারকে ফার্সী এবং উর্দু ভাষায় মন্ডি বলা হয়। সেখান থেকেই এলাকাটির নাম ধানমন্ডি হয়।

ইতিহাস ঘেটে জানা যায়, ধানমন্ডির পাশেই একটি খাল ছিল যা তুরাগ নদীর এবং বুড়িগঙ্গা-এর সাথে সংযুক্ত ছিল। এটা কাওরণ বাজার নদী হিসাবে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকের দিকে হয়তো খালটি শুকিয়ে গিয়েছিল। সেই কারণে হাট হিসাবে ধানমন্ডির গুরুত্ব কমে গিয়েছিল। ধানমন্ডি তখন জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়েছিল। গত শতকের প্রথম পঞ্চাশ-ষাট বছরেও এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে নি।

পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে, ১৯৫০ এর দশকে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে সরকারী উদ্যোগে, অভিজাতদের আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠে ধানমন্ডি। ধানমন্ডি এখন ঢাকার অভিজাতদের অনেকগুলো আবাসিক এলাকার মধ্যে একটি।

ধানমন্ডি লেক বতর্মানে ঢাকা আবাসিক এলাকায় ধানমন্ডি-এর ১৬% এলাকা জুড়ে অবস্থান। লেকের প্রধান সুন্দর হলো পশ্চিম পার্শ্বে ‘জাহাজ বাড়ি’। লেকের উপর রয়েছে বেশ কয়েকটি সেতু। চার পাশে বসার মতো অনেক সুন্দর জায়গা রয়েছে। ভিতরে খাবার ব্যবস্থাও রয়েছে ভাল। বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য ডিপ ফিল্টার বসানো হয়েছে। পরিস্কার পরিচ্ছনতার জন্য রয়েছে ১৫ জন কর্মী। এছাড়া কোন রকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রয়েছে মহিলা গার্ড। এছাড়া প্রায় সারাদিনই ধানমন্ডি থানার পুলিশ লেক টহল দেয়।

প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ সময় কাটানোর জন্য ধানমন্ডি লেকে আসে। ধানমন্ডি লেক এর আশে-পাশে কিছু বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থাকায় এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যাই বেশী। তবে বিকেল হতেই নানা পেশার মানুষের আনাগোনা শুরু হয়। রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চ ঘিরে যেমন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদেও ভীড় থাকে, তেমনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের আশে পাশে থাকে নানা পেশার মানুষের ভীড়। রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চের একটু সামনে বসানো রয়েছে শরীরচর্চাও বিভিন্ন উপকরন, যেখানে সকাল বিকাল অনেকেই আসেন।

ধানমন্ডি লেকের অবস্থান

ঢাকার হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, কলাবাগান, মিরপুর রোড ও শুক্রাবাদ এই কয়েকটি এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে ধানমন্ডি লেকের বিশাল অবস্থান। প্রত্যেকটি এলাকার সাথে ধানমন্ডি লেকের সাথে যোগাযোগের পথ আছে। ধানমন্ডিতে বেশ বড় এলাকা জুড়ে এর অবস্থান। উত্তর-পূর্ব দিকে মিরপুর রোডের অবস্থান। দক্ষিণে ধানমন্ডি ক্লাব এবং আবাসিক এলাকার অবস্থান। আর উত্তরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের অবস্থান।

ধানমন্ডি লেক খোলা ও বন্ধের সময়সুচী

ধানমন্ডি লেকটির  নির্দিষ্ট কোন খোলা ও বন্ধের সময়সূচী নেই তবে ভোর ৫.০০টা থেকে রাত ১০.০০টা পর্যন্ত দর্শনার্থী অবস্থান করতে পারবেন। লেকটিতে প্রবেশের জন্য কোন টিকেটের প্রয়োজন হয় না।

পার্কটিতে বিভিন্ন নামে চত্ত্বর আছে

আয়তনের দিক থেকে লেকটি বিশালাকৃতির হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট কিছু সামাজিক ও রাজনৈতিক কারনে এটি বিভিন্ন নামানুসারে বিভক্ত হয়েছে। জিয়া চত্ত্বর, মেডিনোভা চত্ত্বর, স্যুটিং পয়েন্ট, জাহাজবাড়ি পয়েন্ট, দ্বীপ চত্ত্বর (ডায়নামিক ফুড কোর্ট), লেক ভিউ সাইড, রবীন্দ্র সরোবর (মুক্তমঞ্চ), ডিঙ্গি বোধ ক্লাব এন্ড ক্যাফে চত্ত্বর, সুরধনী চত্ত্বর, ব্যাচেলর পয়েন্ট, দ্বীপ চত্ত্বর (বজরা রেষ্টুরেন্ট), শতায়ু অঙ্গন, লেকপাড় গোল চত্ত্বর, বঙ্গবন্ধু চত্ত্বর, শেখ রাসেল চত্ত্বর, শিকার দ্বীপ, এছাড়া আম্রকানন, বটতলা নামক পয়েন্ট আছে।

পার্কে যেসব গাছ আছে

কৃষ্ণচূড়া, বটগাছ, রেইন্ট্রি, আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, নিমগাছ, বকুল গাছ, কদম গাছসহ বিভিন্ন গাছ রয়েছে এই লেক সংলগ্ন পার্কে।

খাবার ব্যবস্থা

পার্কটিতে রেষ্টুরেন্ট ও ফাষ্টফুড শপ রয়েছে। এছাড়া পার্কটির প্রবেশমুখে কিছু অস্থায়ী দোকান এবং ভেতরেও ফেরিওয়ালারা চা, কফি, বাদাম, ঝালমুড়ি ইত্যাদি বিক্রি করে।

বিবিধ

সৌখিন মৎস্য শিকারীদের জন্য অর্থের বিনিময়ে মাছ শিকারের সুযোগ রয়েছে এখানকার লেকে। এবারের ঈদে অভিজাত পাড়ার মানুষের পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষের বিনোদনের খোড়াক মেটাতে ধানমন্ডি লেকই হতে পারে প্রাণ কেন্দ্র।

ঢাকা, জেইউ, ২৭ জুলাই, টাইমনিউজবিডি.কম//এসএইচ