জনসংখ্যাকে বলা হয় সম্পদ। তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যাকেনয়। কারণ অতিরিক্ত জনসংখ্যা বোঝায় পরিণত হয়। অপুষ্টি, অপর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ, বেকারত্ব, চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা ইত্যাদি সমস্যার মূলে রয়েছে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যা।
তাই মানুষের মধ্যে সচেতনা সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের উদ্যোগে 'বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস'পালিত হচ্ছে।প্রতিবছরের ১১ জুলাইসারা বিশ্বে এ দিবসটিপালিত হয়।
১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা ৫শ’ কোটি পূর্ণ হয়, এ কারণে তখন থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে উদযাপন শুরু হয়। জাতিসংঘের সম্মতিক্রমে ১৯৮৯ সালের ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালন করা হয় বাংলাদেশে।
এরপর ৩১ অক্টোবর ২০১১ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭০০ কোটি হয়েছে। আগামী ১৩ বছরে পৃথিবীতে আরও ১০০ কোটি মানুষ যোগ হবে বলে বিজ্ঞানীরা হিসাব করে দেখিয়েছেন।
ফিলিপাইন প্রথম দাবি করে, ৭০০ কোটিতম শিশুটি জন্ম নিয়েছে তাদের দেশে। ম্যানিলার হোসে ফ্যাবিলা মেমোরিয়াল হসপিটালে জন্ম নেয়া মেয়েশিশুটির নাম রাখা হয়েছে ডানিকা মে কামাচো।
জাতিসংঘের হিসাব মতে, পৃথিবীতে প্রতি সেকেন্ডে জন্ম নিচ্ছে দুটির বেশি শিশু। শুধু ভারতেই প্রতি মিনিটে জন্ম নিচ্ছে ৫১ শিশু। এর মধ্যে ১১টিই জন্ম নেয় সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে। বাংলাদেশের ৭শ’ কোটিতম নবজাতক মেয়ে শিশুটির নাম ঐশী।
তার মায়ের নাম তন্নি হোসেন। আজিমপুর সরকারি মা ও শিশু হাসপাতালে ভূমিষ্ঠ হয় ঐশী। এ উপলক্ষে পুরো হাসপাতালে ছিল উত্সবের আমেজ। আগে থেকেই এ জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেয়া ছিল। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল ইউএনএফপিএ’র উদ্যোগে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা ও দারিদ্র্যের হারের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। ভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার ভিত্তিতে স্বাধীনতার সময় সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা ছিল দেশের বহন ক্ষমতার বাইরে। দারিদ্র্যের হার ছিল ৮০ শতাংশ।
আজকের জনসংখ্যা স্বাধীনতা-উত্তরকালের তুলনায় দ্বিগুণ। এখনও প্রতি বর্গকিলোমিটারে যে জনঘনত্ব, সারা দুনিয়ার সব জনগোষ্ঠীকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হলেও বাংলাদেশে জনঘনত্ব হবে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি।
বিশ্বের দরিদ্রতার মূলে জনসংখ্যা না শোষণ-বৈষম্য? এ প্রশ্নের ওপর ভিত্তি করে একটি বিতর্ক চলে আসছে। সমাজতন্ত্রীরা জনসংখ্যাকে দারিদ্র্যের মূল কারণ হিসেবে দেখেন না। বরং এটাকে তারা সামাজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।
গণতন্ত্রীরা দরিদ্রতার মূলে জনসংখ্যাকেই দায়ী করে আসছেন। জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করে যেসব দেশে শিল্প বিকাশ ঘটছে, সেসব দেশে জনশক্তি কোনো সমস্যা নয়। তাদের সাধারণত জনশক্তি আমদানি করে চলতে হয়।
আজ বিশ্ব এমন এক যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে জনশক্তি রফতানি করেও অনেক দেশ ধনী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সারা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। বাংলাদেশের অধিকাংশ জনসংখ্যা প্রযুক্তি শিক্ষা পরিকল্পনার আওতায় আনার নিরন্তর চেষ্টা অব্যাহত না রাখলে বিপর্যয় অবধারিত।
সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ২৩ লাখ ১৯ হাজার। অথচ জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদন অনুযায়ী এ সংখ্যা ১৬ কোটি ৪৪ লাখ। প্রকৃত জনসংখ্যা যাই হোক, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, জনসংখ্যা আমাদের দেশে সম্পদ না হয়ে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের অর্থনীতি হচ্ছে ঘাটতি বাজেটের। সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম অভাব পূরণ দুরাশা মাত্র। দেশে প্রতি বছর কর্মক্ষম জনশক্তি বাড়ছে, বাড়ছে বেকারের সংখ্যাও। ২০১৫ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ৪ কোটিতে। জনসংখ্যার আধিক্য এদেশে একটি স্থায়ী সমস্যা।
বিশ্বের অনেক শিক্ষিত ও উন্নত দেশগুলোতে ভৌগোলিক আয়তন ও প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যা খুবই কম। তারা উন্নতমানের জীবনযাপন করে। পশ্চিমা দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক। সুশিক্ষার কারণেই তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ করে উন্নত মানের জীবনযাত্রার অধিকারী হয়েছে। উন্নত দেশের শিক্ষার হার ১০০ ভাগ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবমতে প্রতি মিনিটে বিশ্বে ২৫০টি শিশু জন্মগ্রহণ করে আর বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে ৯টি শিশু।
জনসংখ্যা সমস্যা নিয়ে কিছুটা বিতর্কও আছে। অনেকের মতে পৃথিবীর যা সম্পদ রয়েছে তাতে সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ কোটি লোককে জায়গা দেয়া সম্ভব। তাদের মতে ধীরে ধীরে জনসংখ্যা কমিয়ে আনা উচিত। কেবল এভাবেই প্রকৃতির ওপর যে নির্যাতন চলছে তা বন্ধ করা যাবে।
অবশ্য জাতিসংঘ ঠিক এটি না করে কেবল জনসংখ্যা বৃদ্ধিকেই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও উন্নত বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে।
জনসংখ্যা সমস্যায় জর্জরিত চীন এক সন্তান নীতির মাধ্যমে জনসংখ্যা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। আবার কিছু দেশ ঋণাত্নক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের কারণে উল্টো নীতিও গ্রহণ করেছে।
পৃথিবীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা খুব বেশি পুরনো নয়। মূলত কৃষি বিপ্লবই জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। এর পূর্ব পর্যন্ত খাদ্যাভাব পরোক্ষভাবে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতপূর্ণ দেশ হওয়াতে বিষয়টি এখানে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো সেটা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১.৩৯ শতাংশ এবং এ হারে বৃদ্ধি পেতে থাকলে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা ২২ কোটি ২৫ লাখে পৌঁছবে।
আমাদের দেশে রাজধানীর অলি-গলিতে বা দেশজুড়ে নানা ধরনের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। সরকারি নামি-দামি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হতে না পেরে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও অধিক খরচে লেখাপড়া করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। লেখাপড়া শেষে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে দেশে কোথাও চাকরি পাচ্ছে না।
পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত বর্তমানে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ যুবক-যুবতী বেকার। এই বেকার সমস্যা জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তারা যদি কারিগরি বিষয়ক কর্মবান্ধব ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করত তবে দেশে বেকার সমস্যা চোখে পড়ার মতো মনে হতো না। স্ব-উদ্যোগেও সৃষ্টিশীল কর্মোপযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারত।
সরকারি-বেসরকারিবভাবে গড়ে ওঠা শিল্পকারখানায় দক্ষ জনশক্তির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। একজন অদক্ষ কর্মীর চেয়ে দক্ষ কর্মীর মজুরি তিনগুণ বেশি। দক্ষ জনশক্তি রফতানি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়— ইউরোপ, আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও সম্ভব।
জনসংখ্যা ও সাধারণ শিক্ষায় বেকারত্বের সমস্যা থেকে উত্তরণে ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত জনশক্তি রফতানির বিকল্প নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা যা আছে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে, ক্রমহ্রাসমান নিয়মে কমিয়ে আনতে এখন থেকে জোর উদ্যোগ নিতে হবে। মানব সম্পদ উন্নয়ন ও বৃহত্ জনগোষ্ঠীকে কর্মীবাহিনীতে রূপ দিয়ে দেশ-বিদেশে কর্মের সুযোগ করে দিতে পারলেই জনসংখ্যা অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদে পরিণত হবে।
জনসংখ্যাকে কোনো দেশের জীবন্ত সম্পদ বলা হয়। এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে অনেক দেশ উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেছে। কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে পুঁজি করে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করার একটা রীতি বিভিন্ন দেশে চালু আছে। যে দেশ এ কাজটি সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে সে দেশ তত দ্রুত উন্নতির দিকে ধাবিত হয়।
জনসংখ্যা তত্ত্বে ন্যূনতম নির্ভরশীলতার অনুপাত আছে। যখন কোনো দেশ এই ন্যুনতম নির্ভরতার অনুপাতে চলে যায় তখন ওই দেশটির জনসংখ্যাতে কর্মক্ষম জনসংখ্যার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কাজে লাগানোর উপায় হলো তাদের ডিপ্লোমা শিক্ষা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ করে তোলা।
বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান নিম্ন, শ্রমশক্তির দক্ষতা কম— ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রে উত্পাদনশীলতাও কম। বাংলাদেশে মাথপিছু শ্রমশক্তির অবদান ইউএস ডলারে শিল্প ক্ষেত্রে ১১১, ভারতে ১৮৩, ইন্দোনেশিয়ায় ৫৯৬, মালয়েশিয়ায় ২ হাজার ৬৬১, অস্ট্রেলিয়ায় ৮ হাজার ৪৯ এবং জাপানে ১০ হাজার ৭৯৪।
সে হিসেবে বাংলাদেশে মাথাপিছু শ্রমশক্তির অবদান ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় ১৯ ভাগ, মালয়েশিয়ার তুলনায় ১.৪ ভাগ এবং অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের তুলনায় ১ ভাগ ভাগ মাত্র।
শ্রমশক্তির কম দক্ষতা, কম উত্পাদনশীলতার ফাঁদ থেকে বাংলাদেশকে বের হতে হলে গতিশীল ও পরিবর্তনশীল শ্রমবাজারের কথা চিন্তা করে চাকরিদাতা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বিভাগের অংশগ্রহণে পেশা ও জবের কি দাবি তা অব্যাহতভাবে জোগান দেয়ার জন্য অবশ্যই একটা আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
এর সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষা কর্মসূচি, বিশেষ করে ডিপ্লোমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কার করে যথাযথ কারিকুলাম তৈরি এবং বাস্তবায়ন করতে হবে।
সামগ্রিক এই অবস্থায় ডিপ্লোমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে সরকার, শিল্পকারখানার মালিকসহ বেসরকারি উদ্যোগ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রেখে ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ ও পুনঃপ্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার প্ল্যান গঠন, ব্যবস্থাপকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার উন্নয়নে একটি একক কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তাহলেই ‘জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো' এই নীতিবাক্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম হবে দেশের দুশ্চিন্তার অধিক জনসংখ্যা।
এসএইচ/ এআর





