কল্যাণপুর প্রধান সড়ক ধরে কিছু দূর হাঁটলে ডান পাশে ৫ নম্বর সড়ক। এই সড়কের মাঝামাঝি অবস্থানে ছয়তলার একটি বিশাল ভবন। এর প্রধান ফটকে বাড়িটির নাম লেখা ‘তাজ মঞ্জিল’। এই তাজ মঞ্জিল বেশ জীর্ণ এবং বাড়িটিকে ঘিরে এলাকাবাসীর রয়েছে নানা রকম অভিযোগ। আশির দশকে নির্মাণ করা বাড়িটির প্রতিটি তলায় রয়েছে লম্বা বারান্দা। বাড়িটি এলাকাবাসীর কাছে ‘জাহাজ বিল্ডিং’ বা ‘জাহাজ বাড়ি’ নামে পরিচিত, যার মালিক সাবেক শুল্ক কর্মকর্তা আতাহার উদ্দিন আহমেদ।
ছয়তলা বাড়ির প্রতিটি তলায় রয়েছে চারটি করে ইউনিট। দ্বিতীয় তলায় মালিকের ছেলে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। এই বাড়ির অন্য তলার বিভিন্ন ইউনিটে মেস করে ভাড়া থাকতেন ব্যাচেলররা। প্রতি ইউনিটের ভাড়া সাত হাজার থেকে দশ হাজার টাকা।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার পুলিশের অভিযানের পর বাড়ির পুরুষ বাসিন্দাদের থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শিশু ও নারীরা কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন। বিকেলে জঙ্গিদের লাশ নেওয়ার পর তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বাইরে বের হয়ে আসেন। তাঁদের একজন বাড়ির তৃতীয় তলার ভাড়াটে রহিমা বেগম। তিনি বলেন, সকাল ১০টা থেকে বাড়ির গ্যাস ও পানির-সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় তাঁরা বিপাকে পড়েন। অনুরোধ করার পর তাঁরা বের হয়ে আসেন বিকেলে।
স্থানীয় এক মেসের বাসিন্দা বাড়িটি সম্পর্কে বলেন, এই বাড়িতে রয়েছে নানা রকম অব্যবস্থাপনা। ভবনে ছোট ছোট খুপরি করে একটি কক্ষের ভেতর একাধিক কক্ষ বানিয়ে ভাড়া দেওয়া হয়। তা ছাড়া সিঁড়িগুলো সরু। ¬আলো-বাতাস ঢোকে না। তাই নিরুপায় হয়েই লোকজন এখানে বাসা ভাড়া নিত। এর নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল। সারা বছর বাড়ি ভাড়ার নোটিশ ঝোলানো থাকে। তাই প্রচুর অচেনা মানুষের আনাগোনা এখানে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই সুযোগটি হয়তো সন্ত্রাসীরা কাজে লাগিয়েছে। তাঁরা বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা, বিশেষ করে পুলিশ বেশ কয়েকবার এই বাড়িতে অভিযান চালায়। বছর খানেক আগে, মিরপুর মডেল থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন খানের নেতৃত্বে এই বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে নাশকতার অভিযোগে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সালাউদ্দিনই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ঘটনায় প্রাণ হারান। এ ছাড়া এই বাড়িতে মাদকসহ নানা অসামাজিক কাজের জন্য পুলিশ অভিযান চালায়।
কল্যাণপুর কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, আশির দশকে এই বাড়িটি নির্মাণ করা হয়। বাড়ির মালিক আতহার উদ্দিন আহমেদকে অচেনা লোকদের ভাড়া না দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল। অনেকের গতিবিধিও তাঁদের কাছে সন্দেহজনক মনে হতো। এ জন্য ভাড়াটে ফরম পূরণ করে তা পুলিশকে দিতে বলা হয়েছিল। কয়েক দিন আগেও সমিতির পক্ষ থেকে তাঁকে এই ফরম জমা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। তিনি জমা দিয়েছেন কি না, তা সমিতিকে জানাননি আতহার উদ্দিন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, এই বাড়িতে ভাড়াটেদের সঙ্গেও পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল নিয়ে মালিকের বনিবনা হতো না। এর সমাধানে সমিতির কাছে প্রায় অভিযোগ করতেন মালিক। সোমবার দিবাগত রাতে পুলিশের অভিযানের ব্যাপারে মালিকের পক্ষ থেকে সমিতিকে কিছু জানানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, তাজ মঞ্জিলে রাত ১২টার সময় কক্ষ ভাড়া পাওয়া যেত। ভাড়াটের সম্পর্কে কোনো ধরনের তথ্য যাচাই করা হতো না।
কল্যাণপুর প্রধান সড়কের এক নিরাপত্তারক্ষী বলেন, পাগড়ি ও পাজামা-পাঞ্জাবি পরা অনেক যুবক আসতেন এখানে। তল্লাশি করতে চাইলে বেশ রাগ করতেন তাঁরা।
এমবিএইচ





