অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধ ও শাপলা চত্বরে অবস্থানের ওপর আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর অভিযানের তৃতীয় বর্ষ পূর্তি আগামীকাল।
হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে ২০১৩ সালের ৫ মে ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা অবরোধ শেষে লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষ শাপলা চত্বরে অবস্থান নিলে গভীর রাতে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে যৌথ অভিযান চালিয়ে সকালের আলো ফোটার আগেই পুরো এলাকা জনশূন্য করে।
সেই অভিযানে অসংখ্য লোক হতাহত হওয়ার দাবি করে হেফাজত। তবে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের পক্ষ থেকে অভিযানে কেউ মারা যায়নি বলে দাবি করা হয়। পরদিন ৬ মে সকালেও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হয়।
দিনটিকে সামনে রেখে আগামীকাল সারাদেশে দোয়ার কর্মসূচি দিয়েছে সংগঠনটি। হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা মইন উদ্দিন রুহী এই তথ্য জানান। তিনি জানিয়েছেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম শহর, হাটহাজারসহ সারাদেশে দোয়ার কর্মসুচী পালিত হবে।
ঢাকা মহানগরীর যুগ্ম সদস্য সচিব মাওলানা ফজলুল করীম কাসেমী জানিয়েছেন, আগামীকাল বেলা সাড়ে ১২টায় বারাধারস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে হেফাজত ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে আলোচনা ও দোয়ার মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে।
সংবিধানে আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন, কুরআন ও মহানবীর (স.) অবমাননাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান করে আইন পাস, মহানবীর (স.) প্রতি অবমাননকারী নাস্তিক-মুরতাদদের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি, নারী ও শিক্ষানীতি সংশোধনসহ ১৩ দফা দাবির ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবেই হেফাজতে ইসলাম সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছিল।
সেই কর্মসূচি পালনকালে রাতে হেফাজত নেতাকর্মীদের ওপর সাড়াশী অভিযানের ঘটনা ঘটে। মূলতঃ সেটিই ছিল হেফাজতের সর্বশেষ বড় কোন কর্মসূচি। ঘটনায় বহু লোক হতাহত হয় বলে হেফাজতের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। আইন-শৃংখলা বাহিনী ও সরকার কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি দাবি করে।
পরবর্তীতে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ৬১ জন নিহত হবার কথা প্রকাশ করলে সংগঠনটির সম্পাদক আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তাকে গ্রেফতার করা হয়। অবশ্য পরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি তাদের নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদনে ৫ মে ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৩৯ জন নিহত হবার কথা জানায়।
হেফাজত ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে আসলেও এখন পর্যন্ত দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এ ঘটনা তদন্তে কোন কমিটি গঠন করা হয়নি।
২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ৭১-এ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন রায়কে কেন্দ্র করে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ তৈরী হয়।
পরবর্তীতে ওই মঞ্চে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে রাজিব নামে একজন ব্লগার সন্ত্রাসী আক্রমনে খুন হলে ব্লগে তার ইসলাম ও মহানবীকে কটুক্তি করে লেখার বিষয়টি প্রকাশিত হয়। একইভাবে গণজাগরণ মঞ্চের সাথে সম্পৃর্কিত আরো কয়েকজন ব্লগারের ইসলাম বিদ্বেষী লেখার বিষয়েও খবর প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে সারাদেশে ইসলাম দল ও সংগঠনগুলো নাস্তিক ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।
এরই এক পর্যায়ে বেফাকের সভাপতি ও হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম ৯ মার্চ হাটহাজারীতে উলামা সম্মেলন করে ১৩ দফা আন্দোলনের সূচনা করে কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ শেষে রাজধানীর শাপলা চত্বরে ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশ থেকেই ৫ মে ঢাকা অবরোধের কমৃসূচি দেয়া হয়। নানা বাধা-প্রতিবন্ধকতার পরও হেফাজত ঢাকা অবরোধ করে। অবরোধ শেষে শাপলা চত্বরে সমাবেশ করার জন্য সমবেত হতে থাকে।
এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, বায়তুল মোকাররম ও পল্টন এলাকায় সরকার দলীয় নেতা কর্মী ও পুলিশের সাথে হেফাজত কর্মীদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। সন্ধ্যার আগেই বেশ কয়েকজন হেফাজত কর্মী মারা যায়।
অন্যদিকে শাপলা চত্বরে সমাবেশ চলতে থাকে। সন্ধ্যায় হেফাজত শাপলা চত্বরে অবস্থানের ঘোষণা দিলে উত্তেজনা আরো ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে রাতে আইন শুংখলা বাহিনী ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে কমান্ডো স্টাইলে শাপলা চত্বরে অভিযান চালায়। ভোর হওয়ার আগেই শাপলা চত্বর জনশূন্য হয়ে পড়ে। রাস্তায় পড়ে থাকে ধ্বংসস্তূপ।
ঘটনার সাথে সাথেই রাতের আধারে আহত নিহতদের লাশ সরিয়ে ফেলার গুজব উঠে। ঘটনায় অন্ততঃ তিন হাজার হেফাজত কর্মী নিহত হয় বলেও গুজব উঠে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমেও ব্যাপক হতাহতের আভাস দেয়া হয়।
পত্রপত্রিকায় আহত নিহত ও ধবংস স্তুপের ছবিও প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘটনা ও অভিযানের বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পরদিন সকালে নারায়নগঞ্জ হাটহাজারীসহ আরো কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষে আরো বেশ কয়েকজন লোক নিহত হয়।
এরপর সরকার হেফাজতের প্রতি কঠোর নীতি অবলম্বন করতে থাকে। ওই বছর ৬ মে সকালে হেফাজতের আমীর আল্লামা শফীকে বিমান যোগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যায় হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করা হয়।
এ ঘটনায় সারাদেশে হেফাজতে নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়। মূলতঃ এরপর থেকে হেফাজত এখন পর্যন্ত মাঠের বড় কোন কর্মসূচি পালন করতে পারেনি।
অবশ্য কারাবন্দী নেতারা অনেক আগেই মুক্তি পেয়েছেন। নেতাদের অনেকে প্রথমদিকে আত্মগোপনে থাকলেও এখন প্রায় সবাই প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। তবে হেফাজত নেতাদের নামে অসংখ্য মামলা এখনো রয়েছে।
এমআর





