নিত্যপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে রাজধানীর নিম্ন আয়ের মানুষ থমকে যাবে হয়তো। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষ।

৬০ টাকা কেজির নিচে কোনো ধরনের সবজি নেই এখন বাজারে। এক মাসের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে বেড়েছে ৩০ টাকা, চালের দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো অনেক বেশি।

এছাড়া, গত এক বছরে গ্যাসের দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়নোর জন্য কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে গণশুনানি।

এ অবস্থায় নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে প্রতিদিনের বাজার তালিকা। তারা বলছেন, ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে জীবন চালানোই দায় হয়ে পড়েছে!

কারওরানবাজার এলাকায় এক ভ্যান চালকযিনি মূলত সবজি পরিবহনের কাজ করেন। দৈনিক সাড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা আয় করেন তিনি। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান, বাঁচতে হলে রাজধানী ছেড়ে চইলা যাইতে হবে ‘জিনিসপত্রের দাম শুধু বাড়তাছে, কমতাছে না।

“গত এক বছরে আমার আয় একই আছে। কিন্তু ঘরভাড়া থেকে খাওয়া খরচ সব ধরনের ব্যয়ই বেড়েছে। জমানোতো দূরের কথা, ধার করে দেশের বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়।’ কি করবো! না খেয়ে তো আর থাকতে পারিনা ভাই , বর্তমানে বাজারের যে অবস্থা তাতে আমাগো মত গরীব মানুষ নুণ আনতে পান্তা ফুরায়, পরিবার-পরিজন নিয়ে জে দুই'বেলা খাওয়ারই বড় কষ্ট। মধ্যম আয়ের মানুষেরই সমস্যা আর আমাগো মত মিন্তি সারা দিন কেত কামাই!”

একই রকম হতাশার কথা বলনে বেসরকারি চাকরিজীবী এক ব্যক্তি। তিনি রাজধানীর বাসিন্দা। তিনি বলেন, উত্তরা থেকে আমার অফিস মতিঝিল যেতে দুই বছর আগে বাস ভাড়া যা লাগতো, এখন লাগে তার দিগুন। দুই বছরের ব্যবধানে, ১৩ হাজার টাকা বাড়িভাড়া এখন দিতে হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। সন্তানদের স্কুলের বেতন-ভাতাও বেড়েছে, বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের বিলও। কিন্তু আমাদের আয়ের অবস্থা কী ?’

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর হিসেবে গত এক বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম ১৬০ শতাংশ, আদা ৫২ শতাংশ, খোলা সাদা আটা ৯ শতাংশ, বোতলজাত সয়াবিন তেল ৮ শতাংশ, মুগ ডাল ২৮ শতাংশ, খাসির মাংস ২৬ শতাংশ, গরুর মাংশ ১৭ শতাংশ ও ইলিশ মাছের দাম ১৫ শতাংশ বেড়েছে। চালের দাম কমার কথা বলা হলেও সংস্থাটির হিসেবে এখনো তা গত বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির হিসেবে উল্লেখযোগ্য নিত্যপণ্যের মধ্যে বর্তমানে মোটা চাল ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা, সরু চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা, আটা ২৮ থেকে ৩৪ টাকা, ময়দা ৩৪ থেকে ৪৪ টাকা, ১ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ১০৪ থেকে ১০৯ টাকা, দেশি মসুর ডাল ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, মুগ ডাল ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, পেঁয়াজ ৬০ থেকে ৮৫ টাকা, খাসির মাংস ৭৫০ টাকা ও গরুর মাংশ ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে বাস্তবে বাজারে অধিকাংশ পণ্যই এরচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

অথচ গত মাসে এসব সবজির দাম ছিল কম। শীতকাল কাছে চলে আসায় যেখানে জিনিসপত্রের দাম কমার কথা সেখানে হু হু করে বেড়েই চলছে নিত্য পণ্যের দাম। সাধারণ মানুষের যেন নাভিশ্বাস বেড়ে যায় বাজারে আসলেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারে আসা এক পাইকার এর সাথে কথা বললে তিনি জানান,তাদের কিছু করার নেই পথে পথে চাঁদাবাজি। ঢাকা শহরে কোন সবজি আসতে পথে অনেকগুলো জায়গায় পুলিশসহ ক্ষমতাসীন চক্রের চাঁদাবাজির কবলে পড়তে হয় তাদের। তাই শেষমেষ দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের আর কোন গতি থাকে না।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে গত ৮ বছরে (২০০৯ থেকে ২০১৬ সাল) রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৭১ শতাংশ। ক্যাবের এই হিসাব ১১৪টি খাদ্যপণ্য, ২২টি নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী এবং ১৪টি সেবার তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে।

অবশ্য ক্যাবের এই হিসেবে শিক্ষা, চিকিত্সা ও প্রকৃত যাতায়াত ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ক্যাব’র হিসেবে, ওই সময়কালে এক ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ৯৩ শতাংশ, পানির দাম ৫৬ শতাংশ এবং প্রতি কিলোমিটার বাসভাড়া ৪৫ শতাংশ বেড়েছে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’র সভাপতি ড. গোলাম রহমান বলেন, ‘লাগামহীনভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে। চালের দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো অনেক বেশি। পেঁয়াজের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ছে। কোনো কোনো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কারসাজি করে দাম বাড়াতে পারে। এজন্য সরকারের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে। কেউ কারসাজি করে দাম বাড়ালে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

এদিকে দেড় বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত ১ মার্চ থেকে কার্যকর হয় এ দাম। বর্ধিত দর অনুযায়ী আবাসিক গ্রাহকদের বর্তমানে সিঙ্গেল চুলার জন্য ৭৫০ টাকা এবং ডবল চুলার জন্য ৮০০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে- এ বিষয়টি স্বীকার করে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, অতি বৃষ্টির জন্য খাদ্য উত্পাদন ও সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। চলতি মাস থেকে মূল্যস্ফীতির হার কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান বলেন, সম্প্রতি দেশে বন্যা হয়ে গেল। এতে উত্পাদন ব্যাহত হয়েছে। তবে জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে বাজারে সরকারের কঠোর তদারকি করা উচিত। কারণ অনেক ব্যবসায়ী আছে যারা সুযোগ বুঝে দাম বাড়িয়ে দেয়। হাতিয়ে নিচ্ছে সাধারনসহ সকল মানুষরে পকেট থেকে বাড়তি টাকা । তবে আমাদের ভোক্তাদের সংগঠিত হওয়া উচিত বলেও মনে করনে এই অর্থনীতিবিদ।

সোহাগ/ এবি সিদ্দিক